দুই দশকের গোয়ালন্দ

0
241

জালাল মিঞা

পর্ব-২
……………………………………………………………………………………
শুরুতেই অত‌্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে বলে রাখছি, আমার এ লেখাকে গোয়ালন্দের ইতিহাস মনে করবেন না। ইতিহাসের ঘটনা এবং তথ‌্য পরিবেশন করা হয় দিন-তারিখ ধরে। এ লেখায় ঘটনা এবং তথ‌্য তেমন কিছুই নেই। বহমান সময়ের সঙ্গে গোয়ালন্দের সমাজচিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। গত শতকের আশির দশকের মধ‌্য বা শেষার্ধে যাদের জন্ম, তাদের কাছে পুরোনো গোয়ালন্দের গল্প করাই এ লেখার উদ্দেশ‌্য। গল্পের বেশিরভাগ উপাদান নিজের দেখা। কিছু কথা বিশিষ্টজনের কাছে শুনে লেখা। ভুল-ভ্রান্তি কিছু থাকতেই পারে। সে জন‌্য আগেই ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি এবং সঠিক তথ‌্য জানানোর অনুরোধ করছি।

পদ্মা নদী ও গোয়ালন্দ
……………………………………………………………………………………..
পদ্মা নদী এবং গোয়ালন্দ অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত একটি অভিন্ন সত্তা। গোয়ালন্দের পদ্মা নদীর পাড়েই গড়ে উঠেছিল বৃটিশ ভারতের এক সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নদী বন্দর এবং রেল স্টেশন। আমাদের স্মৃতিতে এবং আবেগে পদ্মানদী এবং গোয়ালন্দের জীবন একাকার হয়ে মিশে আছে। আমাদের জন্ম এবং বেড়ে ওঠা এই গোয়ালন্দে।

পদ্মা নদীর পূর্ব অঞ্চলে অবস্হিত ঢাকাসহ যে কোনো জেলার মানুষের জন্য গোয়ালন্দ ছাড়া কোলকাতা যাতায়াতের পথ ছিল না। গত শতকের সত্তরের দশক পর্যন্ত সিলেট, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, নোয়খালীর মানুষ সীমানা টপকে ভারতের মাটিতে যেতে পারতেন। কিন্তু, কোলকাতা যেতে হলে গোয়ালন্দ হয়েই যেতে হতো। কুমিল্লা তখন ত্রিপুরা জেলা হিসেবে পরিচিত ছিল। পাকিস্তান হওয়ার অনেক পরে ত্রিপুরা জেলার পূর্বাংশ কুমিল্লা জেলা হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। বৃহত্তর ময়মনসিংহ ও ঢাকা জেলার মানুষেরও কোলকাতা যাওয়ার পথ হিসেবে গোয়ালন্দের বিকল্প ছিল না। কোলকাতা তখন অবিভক্ত বাংলার রাজধানী। আধুনিক শিক্ষা-দীক্ষা, শিল্প-সাহিত্যের চর্চা, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং রাজনীতি – সব কিছুরই কেন্দ্রভূমি ছিল কোলকাতা।

বৃটিশ ভারতের প্রধান প্রধান নদী-বন্দরগুলোর তালিকায় গোয়ালন্দের অবস্হান ছিল উল্লেখযোগ্য। তখন পূর্ববঙ্গের মাদারিপুর, বরিশাল, সিলেট, আসাম এবং পশ্চিমবঙ্গের দিঘা ঘাট, বক্সার, ডিব্রুগড়, হুগলি এবং আরও কোনো কোনো জায়গার মধ্যে যাত্রীবাহী এবং মালবাহী স্টিমার যাতায়াত করতো। নদীপথে গোয়ালন্দের অবস্হান ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রেল যোগাযোগ স্হাপিত হওয়ার পর পূর্ববঙ্গের যোগাযোগের ক্ষেত্রে গোয়ালন্দের অবস্হানগত গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়।
শুরুতে গোয়ালন্দ ঘাটের অবস্হান ছিল ঠিক পদ্মা-যমুনার সংযোগ স্হানে। পদ্মা নদীর ক্রমাগত ভাঙনে গোয়ালন্দ ঘাট দক্ষিণে সরে আসতে থাকে। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের সময় পদ্মা তার মূল অবস্হান থেকে সাত মাইল দক্ষিণে সরে আসে।
বৃটিশ ভারতে পর্যটকদের দর্শনীয় তালিকায় গোয়ালন্দের পদ্মা নদীর নাম ছিল। বোম্বের দি টাইমস প্রেস থেকে ১৯১৩ সালে প্রকাশিত “From the Hoogly to the Himalayas-an illustrated handbook to the chief places of interest reached by the Eastern Bengal State Railway” নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, “To visit Bengal without travelling on the great river which intersect that province would be almost as bad as going to Agra without seeing the Taj Mahal.” এখানে great river বলতে পদ্মা নদীকে বোঝানো হয়েছে। এর সহজ অর্থ হচ্ছে, পদ্মা নদী না দেখে পূর্ববঙ্গ পরিভ্রমণ করা আর তাজমহল না দেখে আগ্রা পরিদর্শন করা একই রকম অর্থহীন।

পদ্মা নদী ও স্টিমার ঘাট 
…………………………………………………………………………………….
রেল স্টেশনের প্লাটফরমের শেষ প্রান্ত ছিল নদীর দিকে। প্লাটফরমের শেষ প্রান্ত থেকে একটু সামনে এগুলেই স্টিমার ঘাট শুরু। শুকনো মৌসুমে পদ্মার পানি নদীর পাড় থেকে অনেক নিচে নেমে যেত। নদীর পানির স্তর থেকে পাড়ের উচ্চতা কোথায়ও দশ-পনেরো ফুট পর্যন্ত উঁচু হতো। পাড়ের অনেকটা দূর থেকে বিশ ফুটের মতো চওড়া মাপে মাটি কেটে ক্রমান্বয়ে ঢালু করে পানির স্তর পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হতো। ওখান থেকে পাশাপাশি মোটা তক্তা ফেলে ফ্ল্যাটের উপর উঠিয়ে দেওয়া হতো। ফ্ল্যাটের উপর দিয়ে আড়াআড়ি গিয়ে স্টিমারে উঠতে হতো। ফ্ল্যাট থেকে স্টিমারে যাওয়ার জন্য মোটা তক্তা পাতা থাকতো এবং তক্তার উপরে কার্পেটের মতো মোটা চট বিছানো থাকতো। ফ্ল্যাট আকার-আকৃতিতে এবং দেখতে স্টিমারের মতোই। ইঞ্জিনবিহীন। নিজের চলার শক্তি নেই। ফ্ল‌্যাটের দ্বিতীয় তলায় স্টিমার ঘাটের কর্মকর্তাদের থাকার ব্যবস্হা থাকতো। স্টিমার ঘাটের দেখাশুনার দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তিকে বলা হতো ‘ঘাট সুপারভাইজার’।

ফ্ল‌্যাটের নিচের তলায় থাকতো টিকেট ঘর, অন্যান্য দাপ্তরিক প্রকোষ্ঠ এবং মালামাল রাখার জায়গা। নিচ তলার খোলে মালামাল রাখা হতো। ফ্ল‌্যাট বা জাহাজের তলা থেকে নিচ তলার উপরিভাগ পর্যন্ত মাঝখানের খোঁড়ল বা কুঠরির মতো অংশকে খোল বলা হয়। আবার, নৌকার তলা থেকে পাটাতন পর্যন্ত মাঝখানের অংশকেও খোল বলা হয়। কুলিরা বড় বড় লোহার ডালা সরিয়ে সিঁড়ি বেয়ে ফ্ল্যাটের খোলে ওঠা-নামা করতো। স্টিমার থেকে বিরাট বিরাট গাঁইট মাথায় নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে ফ্ল্যাটের খোলে নেমে যেত। আবার, ফ্ল্যাটের খোল থেকে বিরাট বিরাট গাঁইট মাথায় নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে স্টিমারে নিয়ে যেত।

স্টিমারে উঠতে হতো নিচ তলার সামনের অংশ দিয়ে। নিচ তলায় সামনের অংশ ছিল খোলা। মালামাল পরিবহনের জন্য স্টিমারের সামনের দিকের খোলা জায়গার নিচে খোল থাকতো। খোলের জায়গার চেয়ে মালামালের পরিমাণ বেশি হলে উপরের অংশেও রাখা হতো। জায়গা খালি থাকলে যাত্রীরাও ওখানে শুয়ে-বসে যেত।

স্টিমার বা জাহাজের ভেতরে গিয়ে দেখার প্রথম সুযোগ হয় সাত-আট বছর বয়সে। ফ্ল‌্যাটের ভেতর দিয়ে জাহাজে ওঠার পর ডান দিকে যাওয়ার জন্য ঘুরে দাঁড়ালেই ইঞ্জিনের অংশ। জাহাজটিকে লম্বালম্বি চার ভাগে ভাগ করলে নিচ তলার সামনে-পেছনে দুই ভাগ বাদ দিয়ে মাঝখানের দুই ভাগ জুড়ে ইঞ্জিন এবং নানা রকম কল-কব্জা। পিস্টন, শ্যাফট ইত্যাদি আরও নানা রকম অতিকায় সব যন্ত্রাংশ। কল-কব্জার এলাকার দুই দিক দিয়ে সামনে-পেছনে যাওয়া-আসার সরু পথ। কল-কব্জার পাশ দিয়ে আর একটু পেছনের দিকে এগুতেই কখনও নিচের দিকে চেয়ে দেখা যেত, দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। একদিকে গণগণে আগুনের প্রকোষ্ঠ, অন্য দিকে কয়লার স্তুপ। দু জন মানুষ লম্বা হাতলওয়ালা খুপরিতে কয়লা তুলে জ্বলন্ত আগুনের মধ্যে ছুঁড়ে ফেলে দিচ্ছে। তাদের সারা শরীর বেয়ে দরদর করে ঘাম ঝরছে। কয়লা দেওয়ার কাজ হয়ে গেলে এরা বিশাল আকারের লোহার ঢাকনা বন্ধ করে দেবে। তখন উপর থেকে কিছু দেখা যাবে না। এরা সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে আসবে। রেলের ইঞ্জিনেও এ রকমভাবে কয়লা দিতে দেখেছি। সেটা এ রকম ভয়াবহ এবং অমানবিক মনে হয় নি। মাঝামাঝি অবস্থানে অর্ধচন্দ্র আকৃতির বিশাল জানালার লম্বালম্বি ফাঁক দিয়ে জাহাজের পাঙখা দেখা যায়। ফাঁকটা এত ফাঁক নয়, যার ভেতর দিয়ে অনায়াসে মানুষ যাতায়াত করতে পারে। স্টিমার চালু অবস্হায় পাঙখা ঘুরতে তখনও দেখি নি। বেলা উঠার আগে জাহাজ গোয়ালন্দ ঘাটে এসে পৌঁছে এবং রাত দশটার সময় ছেড়ে যায়। ওই সময় যারা ঘাটে থাকে বা কাজকর্ম করে তারা ছাড়া অন্যদের পক্ষে চলন্ত জাহাজ দেখার সুযোগ হতো না। তবে, ছোট ছোট আরও স্টিমার দিনেও চলাচল করতো। ওগুলোর বেশিরভাগই মালবাহী জাহাজ। দূর থেকে দেখেছি।

গোয়ালন্দ ও নারায়নগঞ্জের মধ‌্যে দুটি স্টিমার চলাচল করতো। স্টিমার দুটির নাম ছিল যথাক্রমে ‘গাজী’ এবং অস্ট্রিচ’। এ দুটিই তখন বড় জাহাজ ছিল। কোলকাতার শিয়ালদহ থেকে আসা ‘ঢাকা মেইল’-এর যাত্রী নিয়ে রাত দশটায় গোয়ালন্দ থেকে ছেড়ে যেত। অন‌্যদিকে নারায়নজঞ্জ থেকে ছেড়ে আসা জাহাজটি গোয়ালন্দ পৌঁছে যেত খুব ভোরে। সূর্য ওঠারও আগে। এ সময়সূচি অনুযায়ী চলাচলকারী জাহাজকে বলা হতো ‘মেইল স্টিমার’। মেইল স্টিমার সুরেশ্বর, ভাগ্যকূল, লৌহজং ইত্যাদি নির্দিষ্ট কয়েকটি ঘাটে থামতো। পরের দিন ভোরে চাঁদপুর পৌঁছতো। নারায়ণগঞ্জ পৌঁছতো বেলা দুটোর দিকে। মেইল স্টিমার ছেড়ে যাওয়ার পর গোয়ালন্দ ঘাট থেকে রাত এগারোটার দিকে লোকাল স্টিমার ছেড়ে যেত। লোকাল স্টিমার আরও অনেক ঘাটে থেমে থেমে যেত।

তখন পদ্মা নদী ছিল খরস্রোতা এবং প্রশস্ত। বাতাসের গতি একটু বেশি হলেই পদ্মা প্রমত্ত হয়ে উঠতো। বর্ষাকালে এমনিতেই ভীতিকর রূপ ধারণ করে থাকতো। সেই সঙ্গে বাতাস একটু জোরে বইতে শুরু করলে তো কথাই নেই। ফুঁসে ওঠা পানির গর্জন দূর থেকে শোনা যেত। নদী কখনও একেবারে শান্ত থাকলেও স্রোতের তীব্রতা থাকতোই। দু একবার এমন হয়েছে যে, উত্তাল পদ্মার বাড়াবাড়ির কারণে জাহাজ ছাড়ে নি।

জাহাজগুলো ছিল দুই তলা বিশিষ্ট। দ্বিতীয় তলা নির্দিষ্ট ছিল যাত্রী বহনের জন‌্য। জাহাজে যাত্রীদের জন‌্য চারটি শ্রেণী ছিল। একেবারে সামনে প্রথম শ্রেণী। ভাড়া পঁচিশ টাকা। প্রথম শ্রেণীর সবগুলোই ছিল কেবিন। সামনে খোলা জায়গায় সোফা ও চেয়ার-টেবিল পাতা থাকতো। দ্বিতীয় শ্রেণী ছিল জাহাজের পেছনের অংশে। মাঝখানের গোটা অংশ জুড়ে তৃতীয় শ্রেণী। তৃতীয় শ্রেণীর কিছুটা অংশ জুড়ে ছিল ইন্টার ক্লাশ বা মধ‌্যম শ্রেণী। গোয়ালন্দ-নারায়নগঞ্জ তৃতীয় শ্রেণীর ভাড়া ছিল চৌদ্দ আনা। ইন্টার ক্লাশ বা মধ‌্যম শ্রেণীর ভাড়া ছিল, খুব সম্ভবত, দেড় টাকা বা পৌণে দুই টাকা। ইন্টার ক্লাশে বেঞ্চ পাতা থাকতো। তৃতীয় শ্রেণীতে যাত্রীরা যার যার বিছানা পেতে শুয়ে-বসে যেত। তৃতীয় শ্রেণীকে ‘ডেক’ও বলা হতো।

বছর কয়েক আগে অফিসার্স ক্লাব ঢাকা’র উদ‌্যোগে অস্ট্রিচ স্টিমারে নৌ-বিহারে গিয়েছিলাম। অস্ট্রিচ স্টিমার নামটি আমাকে খুব টেনেছিল। স্টিমারে ওঠার পরে মনটা একেবারে নিথর হয়ে গেল। আমাদের গোয়ালন্দের সেই অস্ট্রিচ স্টিমারের সবই ঠিক আছে। শুধু হৃদয়টা উপড়ে ফেলা হয়েছে। নিচ তলার মাঝখানের সেই বিরাট আকৃতির লোহার কল-কব্জা তুলে পুরো জায়গাটা ঢেকে দেওয়া হয়েছে। স্টিম ইঞ্জিনের জাহাজকে ডিজেল ইঞ্জিনের জাহাজে রূপান্তরিত করা হয়েছে।

অনেক লেখকের বিবরণে গোয়ালন্দের কথা এসেছে। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের যোগাযোগ, নৌকাডুবি উপন্যাসের ঘটনায় গোয়ালন্দের কথা এসেছে। তাঁর ‘খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন’ ছোটগল্পের ভিত্তিতে তৈরি সিনেমায় চাকর রাইচরণের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন মহানায়ক উত্তম কুমার। এক জায়গায় সে তার স্ত্রীকে ডেকে একটি চলন্ত রেলগাড়ি দেখিয়ে বলে, ‘ওই ট্রেনটিতে গোয়ালন্দ যেতে হয়। সেখান থেকে স্টিমারে বিক্রমপুর।’ সংলাপটি হুবহু এ রকম নয়। তবে, গোয়ালন্দের নাম উল্লেখ করা হয়েছে এভাবেই। কবিগুরু নিজেও ঢাকা গিয়েছেন, সে তো গোয়ালন্দ হয়েই। কবি কাজী নজরুল ইসলামও গোয়ালন্দ হয়ে ঢাকা গিয়েছেন। স্টিমারে বসে পদ্মার ঢেউ নিয়ে গান লিখেছেন। বাংলা সাহিত্যের অন্যতম দিকপাল সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ছোটবেলায় তাঁর বাবার সঙ্গে গোয়ালন্দ হয়ে তাঁদের বাড়ি মাদারিপুর গিয়েছেন। এ কথা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের জীবনস্মৃতিমূলক লেখায় উল্লেখ আছে।

গেঞ্জেল ঘাট
…………………………………………………………………………………
গোয়ালন্দ ঘাট থেকে শুরু করে উজানে কয়েক মাইল পর্যন্ত দীর্ঘ ঘাটগুলোকে একসাথে বলা হতো গেঞ্জেল ঘাট। মালবাহী স্টিমারগুলো গন্তব্যে যাতায়াতের পথে গোয়ালন্দ এসে ভিড়তো। গোয়ালন্দে কাস্টম চেকিং হতো। এ ছাড়া, স্টিমার থেকে মালামাল নামানো, মালামাল নামিয়ে জড়ো করে রাখা, অন্য স্টিমারে সে মাল তুলে দেওয়া ইত্যাদি সব কাজ হতো গোয়ালন্দের গেঞ্জেল ঘাটে। একটি ব্যস্ত নদী-বন্দরের সব রকমের কাজই হতো গোয়ালন্দে।

গেঞ্জেল ঘাটের এ মাথা থেকে ও মাথা পর্যন্ত অসংখ্য ফ্ল্যাট বাঁধা থাকতো। ফ্ল্যাট হচ্ছে ইঞ্জিনবিহীন স্টিমার। পণ্যবাহী স্টিমারগুলো এ সব ফ্ল্যাটের গায়ে এসে ভিড়তো। ফ্ল্যাটে কর্মরত বিভিন্ন পর্যায়ের লোকজন স্টিমারের মালামাল খালাস ও বোঝাইয়ের কাজ দেখাশুনা ও তদারকি করতো। ফ্ল্যাটগুলোতে কর্মরত লোকদের ওইসব ফ্ল্যাটেই থাকা-খাওয়ার ব্যবস্হা থাকতো।

লঞ্চঘাট
…………………………………………………………………………………..
স্টিমার ঘাট থেকে কিছুটা ভাটিতে ছিল লঞ্চঘাট। লঞ্চগুলো শিবালয়, সুরেশ্বর, ভাগ্যকূল, লৌহজং, রাজবাড়ি, পাবনা, রাজশাহী ইত্যাদি জায়গার মধ্যে পণ্য ও যাত্রী বহন করতো। দু একটি লঞ্চ গোয়ালন্দ এবং ঢাকার সদরঘাট রুটে চলাচল করতো।
১১ নভেম্বর ২০১৭

পর্ব-৩

গোয়ালন্দ ঘাট ও বাজার
……………………………………………………………………..
পাকিস্তান আমলে গোয়ালন্দের কোথায়ও পাকা রাস্তা ছিল না। রেল স্টেশনের প্লাটফরম ছিল কয়লার খোয়া বিছানো। পদ্মার ভাঙনে প্রতি বছরই স্টিমার ঘাট, রেল স্টেশন পেছনে সরে যেত। এ জন্যই গোয়ালন্দ স্টিমার ঘাট ও রেল স্টেশনে এবং বাজারে কোনো স্হাপনাই পাকা করা হতো না।

রেলের প্লাটফরম এবং স্টিমার ঘাট মিলিয়ে বলা হতো গোয়ালন্দ ঘাট। রেলের প্লাটফরমের শেষ প্রান্তের শ খানেক মিটার পর থেকেই স্টিমার ঘাটের শুরু। আর, গোয়ালন্দ বাজার বলতে মূলত স্টিমার ঘাটের দিকে মুখ করে দাঁড়ালে বাম দিকের বাজারকেই বোঝাতো। স্টিমার ঘাটের দিকে মুখ করে দাঁড়ালে ডান দিকের বাজার ছিল আড়ত প্রধান। এ জন্য এ অংশের বাজারকে আড়তপট্টি নামেও অভিহিত করা হতো। এ বাজারকে কখনও দুই নম্বর বাজার বলতেও শুনেছি। আবার কখনও একেম মৃধার বাজার, হানিফ মোল্লার বাজার নামেও বলতে শুনেছি। একেম মৃধা (একীন আলী মৃধা) ছিলেন দৌলতদিয়া ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট এবং হানিফ মোল্লা ছিলেন উজানচর ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট। পরবর্তীতে সরকারিভাবে ইউনিয়ন বোর্ডকে ইউনিয়ন কাউন্সিল এবং প্রেসিডেন্টকে চেয়ারম্যান হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। একেম মৃধা, হানিফ মোল্লা দু জনই গোয়ালন্দের নেতৃস্হানীয় এবং মান্যবান ব্যক্তি ছিলেন।

ছয় নম্বর
……………………………………………………………………..
ঘাট-বাজার এলাকার বাইরের গ্রাম থেকে গোয়ালন্দে আসার সময় বলা হতো, “ছয় নম্বর যাই।” গোয়ালন্দ থেকে ফিরে গিয়ে বলা হতো, “ছয় নম্বর থ্যা আলাম।” ছয় নম্বর বলতে গোয়ালন্দের স্টিমার ঘাট, রেল স্টেশন, দুই বাজার মিলিয়ে গঠিত গোটা এলাকা বোঝান হতো।

গোয়ালন্দকে ছয় নম্বর হিসেবে কেন চিহ্নিত করা হতো এবং এর আগের আর পাঁচটি নম্বরযুক্ত জায়গাগুলো কোথায় – এ সব প্রশ্ন আমাদের মাথায় আসে নি। অনেক পরে শুনেছিলাম যে, আমাদের দাদাদের সময়ে গোয়ালন্দ স্টিমার ও রেল স্টেশন ছিল, এখন যেখানে দৌলতদিয়া ঘাট, সেখান থেকে আরও অনেকটা উজানে। সেটা ছিল এক নম্বর গোয়ালন্দ। আর পঞ্চাশের দশক থেকে যেখানে গোয়ালন্দ ঘাট দেখে আসছি, ওটা ছিল ছয় নম্বর গোয়ালন্দ। এক নম্বর গোয়ালন্দের দিকে রেল লাইন গিয়েছিল কাটাখালি হয়ে উত্তর দৌলতদিয়ার উপর দিয়ে। বর্তমান ১ নম্বর বেপারি পাড়ার কাছে ওই সময় একটি রেলের পুল ছিল। উনসত্তর-সত্তর সালের দিকে পদ্মা নদী ভাঙতে ভাঙতে বেপারি পাড়ার কাছাকাছি এসে পড়েছিল। তখন শুকনো মৌসুমে পদ্মার পানি কমে নিচে নেমে গেলে একবার ওই পুলের পিলার জেগে উঠেছিল। পিলারটি অসম্ভব মজবুত ছিল। নদী ভেঙে বেপারি পাড়ার দিকে এগিয়ে আসতে থাকায় বছর দুয়েকের মধ্যে ওই পিলারটি আবার মাটির নিচে চলে যায়। পিলারকে আমাদের ভাষায় বলা হতো ‘গাঁটোর’।

গোয়ালন্দ বাজার
……………………………………………………………………..
গোয়ালন্দ বাজারে মনিহারি জিনিষপত্র, চাল, কাপড়-চোপড়, খাবার হোটেল, চা-মিষ্টি ইত্যাদি বেচাকেনার জন্য স্হায়ী দোকান ছিল। ধান-পাটসহ অন্যান্য কৃষিপণ্য, মাছ, গুড় ইত্যাদি বেচাকেনার বাজার বসতো খোলা জায়গায়। সপ্তাহে শনিবার এবং বুধবার দু দিন হাট বসতো। এ দু দিন বিপুল সংখ্যক জনসমাগম হতো। বিশেষ করে ধান এবং পাটের বাজারে ভিড় হতো বেশি। তখন এ দেশের শতকরা প্রায় পঁচানব্বই ভাগেরও বেশি মানুষের জীবিকার অবলম্বন ছিল কৃষি। বাকি পাঁচ ভাগের মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি কৃষি পরিবারের চাকুরিজীবী। শুধুই চাকুরি বা ব্যবসায়ের উপর নির্ভরশীল মানুষের সংখ্যা ছিল নিতান্তই কম। কৃষি নির্ভর জীবনের খাওয়া-পড়া এবং অন্যান্য সব ধরনের চাহিদা পূরণের জন্য ধান এবং পাট ছিল প্রধান দুটি অর্থকরী কৃষি ফসল। পরিবারের খাওয়ার চাহিদা পূরণের পর উদ্বৃত্ত ধান বিক্রয় করে নগদ অর্থ হাতে আসতো। পাট চাষ করাই হতো নগদ অর্থ লাভের উদ্দেশ্যে। এ দুটি পণ্য নিয়ে কৃষিজীবী মানুষজন হাটে আসতো। ধান-পাট বিক্রয় করে তেল-নুনসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় বাজার নিয়ে বাড়ি ফিরতো। ছোট পাট ব্যবসায়ীরা গোয়ালন্দ হাট থেকে পাট ক্রয় করে বড় পাট ব্যবসায়ীদের গুদামে নিয়ে যেত। ছোট পাট ব্যবসায়ীদের বলা হতো ফরিয়া – আমাদের ভাষায় ‘ফইর‌্যা’।

লাউ, মিষ্টি কুমড়া, চাল কুমড়া, মরিচ, বেগুন, টমেটো ইত্যাদি গৃহস্হ বাড়ির পালানে আবাদ করা হতো। আলু, পেঁয়াজ, রসুন, সরিষা, ডাল, পটল, উচ্ছে, খিরাই, তরমুজ, বাঙি ইত্যাদি আবাদ করা হতো ক্ষেতে। অনেকেই বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে পটল এবং তরমুজ আবাদ করতো। বাকি আর সব ফল-ফলাদি এবং শাক-শব্জিতে নিজেদের চাহিদা পূরণ হয়ে যেত। চাহিদা মিটে উদ্বৃত্ত থেকে গেলে বিক্রয়ের জন্য হাটে নিয়ে যাওয়া হতো। এ সব কৃষি পণ্যের ক্রেতারা ছিলেন মূলত চাকুরির সুবাদে যাঁরা গোয়ালন্দে থাকতেন তাঁরা। তাঁরা গোয়ালন্দের মানুষ ছিলেন না। এঁদের মধ্যে রেলের চাকুরিজীবীদের সংখ্যাই ছিল বেশি। এ ছাড়া ছিলেন শুল্ক বিভাগের চাকুরিজীবীবৃন্দ, প্রধান স্টিমার ঘাটসহ গেঞ্জেল ঘাটের অনেকগুলো ফ্লাটের কর্মচারীবৃন্দ এবং প্লাটফরমের ভাসমান মানুষ। আরও ছিলেন কিছু দোকানদার, অবাঙালি ব্যবসায়ী এবং অন্যান্য জীবিকার কিছু মানুষ।

গোয়ালন্দের কৃষিপণ্যের মধ্যে তরমুজ এবং পটলের দেশজোড়া খ্যাতি ছিল। স্কুলের পাঠ্য বইয়ে দেশের কোন জায়গা কেন এবং কিসের জন্য বিখ্যাত অধ্যায়ে গোয়ালন্দ সম্পর্কে উল্লেখ থাকতো- গোয়ালন্দ রেলওয়ে স্টেশন এবং নৌ বন্দরের জন্য বিখ্যাত। এ ছাড়া, গোয়ালন্দে উন্নত মানের তরমুজ এবং পটল উৎপাদিত হয়। বইয়ে এ সব তথ‌্য পড়ার সময় আমাদের হাসি পেত। আমাদের দেখা বিষয় পাঠ‌্য বইয়ে পড়ছি। একইসঙ্গে গর্বও হতো। বিখ‌্যাত স্থানের তালিকায় গোয়ালন্দের নাম আছে।

জনমুখর গোয়ালন্দ ঘাট
……………………………………………………………………..
গোয়ালন্দ ঘাটের প্রাণকেন্দ্র ছিল রেল স্টেশন ও স্টিমার ঘাট। রেল লাইনের শেষ প্রান্ত থেকে স্টিমার ঘাট শুরু। রেল স্টেশন ও স্টিমার ঘাট এলাকায় খাবার হোটেল, চা-মিষ্টির দোকান, মনিহারি দোকান ইত্যাদির সমারোহ। ঘাটের পূর্ব দিকেই মাছের খলা। প্রায় সারা রাত ধরে খলায় বরফ ভাঙা এবং প্রধানত ইলিশ মাছ বাক্সজাত করার কাজ চলতো। গভীর রাতে কখনও ঘুম ভেঙে গেলে বরফ ভাঙার ধুপধাপ শব্দ পাওয়া যেত। আবার বেশি রাতে দু একটি ট্রেন আসতো বা ছেড়ে যেত। এ জন্য রেল স্টেশনের কিছু মানুষ সারা রাত জেগে থাকতো এবং ওয়াচম্যানরা সারা রাত জেগে প্লাটফরমের মালামাল এবং রেলের সম্পদ পাহারা দিত। মাছের খলা এবং রেল স্টেশনের মানুষজনের প্রয়োজনে দু একটি চা-বিস্কুটের দোকান সারা রাতই খোলা থাকতো। রাতের বেলা কর্মমুখর মাছের খলা দেখি নি। দিনের বেলা কখনও ওদিকে গেলে কাঠের বাক্সগুলো এলোমেলো পড়ে থাকতে দেখেছি।
১২ নভেম্বর ২০১৭

পর্ব-৪

গোয়ালন্দ রেল স্টেশন ও রেল যোগাযোগ
………………………………………..
গোয়ালন্দ থেকে সকাল সাতটায় শিয়ালদহের উদ্দেশ্যে ঢাকা মেইল ছেড়ে যাওয়ার এক ঘন্টা পরে শিলিগুড়ি নামে আর একটি ট্রেন ছেড়ে যেত। শিলিগুড়ি পোড়াদহ থেকে দিক পরিবর্তন করে পাকশি, ঈশ্বরদি, পার্বতীপুর – ওই দিকে কোথায় যেন যেত।

ওদিকে আমাদের তেমন যাওয়া হয় নি বললেই চলে। এরপর ছেড়ে যেত খুলনা মেইল। খুলনা মেইল রাজবাড়ি, কুস্টিয়া, যশোর হয়ে খুলনা পর্যন্ত যেত। খুলনা মেইল মাঝখানে আরও অনেক স্টেশনে থামতো। এভাবে সারা দিনে আরও কয়েকটি ট্রেন গোয়ালন্দ আসা-যাওয়া করতো। গোয়ালন্দ স্টেশন থেকে ট্রেন ছেড়ে যাওয়ার কিছুক্ষণ পরেই ‘ঘিওর বাজার’ নামে একটি স্টেশন ছিল। লোকাল ট্রেন ওই স্টেশনে সামান্য সময়ের জন্য থামতো। একটু বড় হয়ে যখন স্কুলে পড়াশুনা শুরু করেছি, তখন থেকে আর ওই নামের কোনো স্টেশন দেখি নি। গোয়ালন্দ থেকে ফরিদপুর সরাসরি কোনো ট্রেন যেত না। রাজবাড়ি অথবা পাঁচুরিয়া থেকে ট্রেন বদল করে ফরিদপুর যেতে হতো।

পূর্ব-পাকিস্তান রেলওয়ের বগিগুলো ছিল সবুজ রঙের। পূর্ব-পাকিস্তান রেলওয়ের বগিগুলোর গায়ে লেখা থাকতো EBR (East Bengal Railway) বা পূর্ব বাংলা রেলওয়ে। পরে লেখা হতো EPR (East Pakistan Railway) বা পূর্ব পাকিস্তান রেলওয়ে।

বগিগুলো ছিল চার শ্রেণীর। ফার্স্ট ক্লাশ বা প্রথম শ্রেণীর বগি, সেকেন্ড ক্লাশ বা দ্বিতীয় শ্রেণীর বগি, ইন্টার ক্লাশ বা মধ্যম শ্রেণীর বগি এবং থার্ড ক্লাশ বা তৃতীয় শ্রেণীর বগি। সরকারের উচ্চ পদস্হ কর্মকর্তারা এবং সমাজের ধনাঢ্য ব্যক্তিরা ফার্স্ট ক্লাশ ও সেকেন্ড ক্লাশ বগিতে যাতায়াত করতো। ইন্টার ক্লাশ বগিতে সাধারণ চাকুরিজীবী, শিক্ষক এবং অন্যান্য শ্রেণীর সচ্ছল ব্যক্তিরা যাতায়াত করতো। বলার অপেক্ষা রাখে না, বাকিরা যাতায়াত করতো থার্ড ক্লাশ বগিতে।
ইন্টার ক্লাশ ও থার্ড ক্লাশের মহিলাদের জন্য ভিন্ন বগি থাকতো। ওই সব বগির গায়ে ‘মহিলা’ লেখা থাকতো। উর্দুতে লেখা থাকতো ‘জেনানা’। তাদের সঙ্গের পুরুষ মানুষ পুরুষদের বগিতে থাকতো।

ইন্টার ক্লাশ এবং থার্ড ক্লাশ বগিতে চার সারিতে বসার বেঞ্চ থাকতো। দুই দিকে জানালার পাশে দুই সারি এবং মাঝখানে পিঠাপিঠি দুই সারি। সব বগি সমান আকারের হতো না। কোনো কোনো বগি আকারে বড় হতো। কোনো কোনো বগি হতো অপেক্ষাকৃত ছোট আকারের। বগির ভেতরে দুই পাশের দেওয়ালে বগির ধারণ ক্ষমতা লেখা থাকতো “৪০ জন বসিবেক”, ২৮ জন বসিবেক” ইত্যাদি। ৪০ জন বসিবেক অর্থ ৪০ জন বসিবেন বা ৪০ জনের বসার জন্য। তখন বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্রের লেখায় এ ধরনের শব্দ পাওয়া যেত।

পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে পূর্ববঙ্গের রেল যোগাযোগের প্রথম পর্যায়ে ১৮৬২ সালে কোলকাতা থেকে কুস্টিয়া পর্যন্ত রেল লাইন স্হাপিত হয়। কুস্টিয়া থেকে গোয়ালন্দ পর্যন্ত ৭৫ কিলোমিটার রেল লাইন স্হাপনের কাজ সমাপ্ত হয় ১৮৭০ সালে। ১৮৭১ সালের ১ জানুয়ারি তারিখে কুস্টিয়া-গোয়ালন্দ রেল লাইনের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়।(বাংলাপেডিয়া: ইন্টারনেট সংস্করণ)।

বৃটিশ ভারতে গোয়ালন্দ রেল স্টেশন ছিল ইউরোপীয় মানের প্রথম শ্রেণীর রেল স্টেশন। ইউরোপীয় মানের প্রথম শ্রেণীর রেল স্টেশনে বাঙালি তো নয়ই, কোনো ভারতীয়কেও দায়িত্ব দেওয়া হতো না। গোয়ালন্দ রেল স্টেশনের স্টেশন মাস্টার বরাবরই থাকতো ইংরেজ। বড়দের কাছে সে সব ইংরেজ স্টেশন মাস্টারদের নানা গল্প শুনেছি। এর মধ্যে বৃটিশ শাসনের শেষের দিকে দায়িত্ব পালনকারী দুজন স্টেশন মাস্টারের কথা তাঁদের অনেকেরই মনে ছিল। একজন আলেকম সাব এবং আরেকজন প্যাস্কল সাব। নাম দুটির উচ্চারণ হুবহু এ রকম নাও হতে পারে। ইংরেজদের নাম সঠিকভাবে উচ্চারণ করা তখনকার মানুষের কাছ থেকে আশা করা যায় না। এরা নাকি স্হানীয় লোকজনের হাডুডু খেলা পছন্দ করতো। এ ছাড়া, গোয়ালন্দ পূর্ব-বাংলার গুরুত্বপূর্ণ নদী-বন্দর এবং রেল স্টেশন হওয়ায় সব সময়ই গোয়ালন্দ হয়ে ইংরেজ নারী-পুরুষ যাতায়াত করতো। নানা কাজের সুবাদে ইংরেজ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা গোয়ালন্দ আসতো।

ওই সময়ের গোয়ালন্দের কিছু শ্রমজীবী মানুষ ইংরেজদের সঙ্গে কাজও করতো। ফাই-ফরমাশ খাটা, রান্না-বান্নার কাজ করা ইত্যাদি আরও অনেক রকম ছোঠখাটো কাজ করতো। ইংরেজদের সঙ্গে কাজ করে এরা কিছু কিছু ইংরেজি বুলিও আয়ত্ত করেছিল। ইংরেজি শব্দের উচ্চারণ ঠিকঠাক হতো না। তবে, ইংরেজদের সঙ্গে কাজ করার জন্য প্রয়োজনীয় ভাবের আদান-প্রদানের কাজ চলে যেত। এদের একজনের নাম ছিল ইমান। ইমান নাপিত নামে তাকে সবাই চিনতো। আমরা ছোটবেলা থেকেই ইমান নাপিতের সেলুনে চুল কাটাতাম। ইমান নাপিতের সেলুনে চুল কাটাতে যাওয়ার একটি বাড়তি আকর্ষণ ছিল তার মুখে ইংরেজি শোনা। আমরা কিছুই বুঝতাম না। আনন্দ পেতাম। বড়রাও আনন্দ পেত। ইংরেজি কি হলো না হলো সেটা কেউ বিচার করতো না। সবাই শুনতো আর হাসতো।

গোয়ালন্দ ঘাটের রেল শ্রমিকদের সংখ্যা ছিল অনেক। এদের বলা হতো রেলের কুলি। তখন যাঁরা শ্রমিক শ্রেণীর রাজনীতি করতেন, তাঁদের কাছে গোয়ালন্দ রেল শ্রমিকদের গুরুত্ব ছিল। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু ১৯৪০ সালে ব্যারিস্টারি পাশ করে এসে সরাসরি কমুনিস্ট পার্টিতে যোগদান করেছিলেন। পার্টি থেকে তাঁকে পূর্ববাংলা রেল শ্রমিক সংগঠনের মধ্যে কাজ করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। ভারত বিভাগের পরেও জ্যোতি বসুর সঙ্গে নিশ্চয়ই সেই পূর্ব-সম্পর্কের জের থেকে গিয়েছিল। ১৯৫২ সালে জ্যোতি বসু গোয়ালন্দ রেল শ্রমিকদের এক সভায় যোগদান করেছিলেন। তখন তিনি পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যসভার নির্বাচিত সদস্য ছিলেন। প্রয়াত জাতীয় অধ্যাপক কবীর চৌধুরি তখন ফরিদপুর রাজেন্দ্র কলেজের শিক্ষক।

তি বসুকে দেখার জন্য এবং তাঁর কথা শোনার জন্য তিনি ফরিদপুর থেকে গোয়ালন্দ এসেছিলেন। জ্যোতি বসুর মহপ্রয়াণের পর ৪ ফেব্রুয়ারি ২০১০ তারিখ বৃহস্পতিবার ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার চত্বরে নাগরিক কমিটির উদ্যোগে এক স্মরণ সভার আয়োজন করা হয়। ওই সভায় অধ্যাপক কবীর চৌধুরি তাঁর আলোচনায় এ কথা উল্লেখ করেন।

গোয়ালন্দ-কোলকাতা রেল যোগাযোগ
…………………………………..
গোয়ালন্দ-শিয়ালদহের মধ‌্যে সরাসরি ট্রেন যাতায়াত করতো। পশ্চিমবঙ্গের শিয়ালদহ থেকে আসা এ ট্রেনটির নাম ছিল ‘ঢাকা মেইল’। নারায়ণগঞ্জ থেকে মেইল স্টিমারটি ভোর ছয়টা-সাড়ে ছয়টার মধ্যেই গোয়ালন্দ পৌঁছে যেত। গোয়ালন্দ মাছের খোলায় প্রায় সারারাত ধরে বরফ ভাঙা, মাছ বাক্সজাত করা এবং মালগাড়িতে তোলার কাজ চলতো। নানা রকম মাছের মধ্যে ইলিশ মাছই ছিল প্রধান। স্টিমারের যাত্রী এবং মাছের বগি নিয়ে সকাল সাতটায় ঢাকা মেইল গোয়ালন্দ থেকে শিয়ালদহের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যেত। ঢাকা মেইল চলার পথে খুব বেশি রেল স্টেশনে থামতো না। গোয়ালন্দ থেকে একটানে রাজবাড়ি। মাঝখানে পাঁচুরিয়া থামতো না। রাজবাড়ি থেকে কুস্টিয়ার মাঝখানে আর কোনো স্টেশনে থামতো না। এরপরে পোরাদহ এবং চুয়াডাঙা হয়ে দর্শনা। দর্শনা ছিল এপাড়ের শেষ স্টেশন। দর্শনায় কাস্টম চেকিং হতো। এরপর দর্শনা পার হলেই পশ্চিমবঙ্গের সীমানা শুরু। কোলকাতার শিয়ালদহ স্টেশনে পৌঁছে যেত দেড়টা-দুটোর মধ্যেই। আবার শিয়ালদহ থেকে ছেড়ে আসা ঢাকা মেইলটি গোয়ালন্দ এসে পৌঁছতো রাত নয়টার মধ্যে।
পশ্চিমবঙ্গ সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন ‘ঢাকা মেইল’-এর বগিগুলো ছিল লাল রঙের।

গোয়ালন্দের ইলিশ মাছ কোলকাতায়
………………………………….
পশ্চিমবঙ্গের মানুষও গোয়ালন্দের ইলিশের জন্য অপেক্ষা করে থাকতো। Indian Journal of Fisheries-এ On the late winter and early spring migration of Indian Shad, Hilsa Ilisha (Hamilton), in the Gangetic delta শিরোনামে প্রকাশিত Mr.S. Jones-এর একটি গবেষণা নিবন্ধে প্রদত্ত সারণি ও গ্রাফে ১৯৫৪ সালে গোয়ালন্দ এবং লালগোলা ঘাট থেকে কোলকাতায় ইলিশ এবং অন‌্যান‌্য মাছ রফতানির পরিমাণ দেখানো হয়েছে (লেখার শেষে সারণি ও গ্রাফ যুক্ত করা হয়েছে)। সারণি ও গ্রাফ অনুযায়ী দেখা যাচ্ছে, ১৯৫৪ সালে গোয়ালন্দ থেকে কোলকাতায় সকল প্রকার মাছ রপ্তানির পরিমাণ ছিল ২ লক্ষ ৪২ হাজার ৯৬১ মন। এর মধ্যে শুধু ইলিশ মাছের পরিমাণ ছিল ১ লক্ষ ৩১ হাজার ৫৯৫ মন। (১ মন=৮২.২৮ পাউন্ড)। কোলকাতা মাছের বাজারের আর একটি উৎস ছিল লালগোলা ঘাট। সারণিতে দেখা যাচ্ছে, একই সময়ে লালগোলা ঘাট থেকে কোলকাতায় রপ্তানিকৃত মাছের পরিমাণ গোয়ালন্দ থেকে রপ্তানিকৃত মাছের পরিমাণের তুলনায় নিতান্তই নগণ্য।

গোয়ালন্দে হাটের দু দিন ছাড়া অন্যান্য দিন সকালে শুধু মাছের বাজারটা জমে উঠতো। বেলা নয়টা-দশটার মধ্যেই শেষ হয়ে যেত। সারাদিন বাজারটা ঝিমিয়ে থাকতো। বিকেলে আবার একটু সরগরম হয়ে উঠতো। অনেকে প্রয়োজনে আসতো, অনেকে শুধুই ঘুরে বেড়ানোর জন্য আসতো। তবে, রেল স্টেশনের এলাকায় সারাক্ষণ মানুষের আনাগোনা থাকতোই। দিনে বেশ কয়েকবার ট্রেন যাওয়া-আসা করতো। যতবার ট্রেন আসতো এবং যেত, ততবারই প্লাটফরম মুখর হয়ে উঠতো।

১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পর গোয়ালন্দ-কোলকাতা ট্রেন চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়। তখন থেকে গোয়ালন্দ রেল স্টেশনের গুরুত্ব কমতে থাকে। ১৯৭২-৭৩ সালের পর থেকে পদ্মা নদীর নাব্যতা হ্রাস পেতে থাকে। স্টিমার চলাচলের সমস্যা দেখা দেয়। ১৯৭৫-৭৮ সালের দিকে কোনো এক সময় স্টিমার চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। গোয়ালন্দ তার শতাধিক বছরের খ্যাতি ও ঐতিহ্য হারিয়ে সাধারণ রেল স্টেশনে পরিণত হয়।
১৩ নভেম্বর ২০১৭

পর্ব-৫

ছোটদের খেলাধুলা ও রেললাইন
……………………………..
গত শতকের পঞ্চাশ দশকের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত আমরা যে গ্রামে বসবাস করতাম, সেই গ্রামের সামনের দিকেই ছিল রেল লাইন। আমাদের গ্রামের সামনে দিয়ে রেল গাড়ি বা ট্রেনগুলো চলে যেত গোয়ালন্দ রেল স্টেশনের দিকে এবং গোয়ালন্দ রেল স্টেশন থেকে ছেড়ে আসা রেল গাড়ি বা ট্রেনগুলো খট খটাখট খট খটাখট শব্দ তুলে চলে যেত দক্ষিণ দিকে। গোয়ালন্দ রেল স্টেশন ছিল আমাদের গ্রাম থেকে মাইল দেড়েক উত্তরে।

আমাদের বাড়ি বরাবর রেল লাইনের ওপাড়েই বেশ গভীর এবং বড় কয়েকটি খাল বা ‘মাইট্যাল’ ছিল। বর্ষাকালে রেল লাইনের দু দিক থৈ থৈ পানিতে ভরে যেত। বর্ষার পানি আসার আগে টানা বৃষ্টি হলে রেল লাইনের ওপাড়ের মাইট্যালগুলো পানিতে ভরে যেত। বড় বড় ব্যাঙ মাইট্যালের পাড়ে উঠে গলার দু পাশ ফুলিয়ে কোরাসের মতো এক সাথে প্রচন্ড শব্দে ঘ্যাঁ ঘুঁ ঘ্যাঁ ঘুঁ ঘ্যাঁ ঘুঁ করে ডাকতে থাকতো। আমরা ছোটরা একসঙ্গে ব্যাঙের ডাক শোনার জন্য মাইট্যালের পার ধরে দাঁড়িয়ে যেতাম। রাতের বেলা ব্যাঙের ডাক শুধু শোনা যায়, দেখা যায় না। দেখে দেখে ব্যাঙের ডাক শোনার আনন্দই অন্য রকম। আনন্দকে ষোল কলায় পূর্ণ করার জন্য আমাদের আর একটি খেলা ছিল। ব্যাঙকে লক্ষ্য করে ঢিল ছোঁড়া। ব্যাঙের গায়ে ঢিল লাগার সঙ্গে সঙ্গে ব্যাঙটি টুপ করে পানিতে ঝাঁপ দিয়ে অদৃশ্য হয়ে যেত।

আমাদের আর একটি আকর্ষণীয় খেলা ছিল ট্রেনের সময় হলে দল বেঁধে রেল লাইনের ঢালুতে দাঁড়িয়ে খট খটাখট খট খটখট শব্দ তুলে ট্রেনের ছুটে যাওয়া দেখা। আমাদের গ্রামের সামনে দিয়ে ট্রেন খুব দ্রুত গতিতে ছুটে যেত। কখনও ঝড়ের মতো ধূলো উড়িয়ে ট্রেন ছুটে যেত। আমরা মাঝে মাঝে ট্রেন দূরে থাকতেই রেলের উপর ধাতব মুদ্রার দুই পয়সা, এক আনা রেখে দিতাম। ট্রেন চলে যাওয়ার পর ওগুলো চেপ্টা হয়ে যেত। ট্রেনের ঝাঁকুনিতে অনেক সময় পয়সা রেল থেকে পড়ে যেত। এ জন্য আমরা থু থু লাগিয়ে পয়সাগুলো রেলের উপর বসিয়ে দিতাম। এতে ঠিকই কাজ হতো। এ বুদ্ধিটি আমরা কারও কাছে শিখি নি। তখন আমাদের বয়স সাত-আট বছরের মধ্যে হবে।

রেল গাড়ি ও ট্রলি
…………………..
আমরা রেল গাড়িকে কখনও রেল গাড়ি, কখনও শুধু গাড়ি বলতাম। কখনও ট্রেনও বলতাম। মালবাহী বগিকে বলা হতো মাল গাড়ি। কখনও কখনও দেখেছি অনেকগুলো মাল গাড়ি নিয়ে ট্রেন আসতো। সঙ্গে কোনো যাত্রীবাহী বগি থাকতো না। সাধারণত একটি ট্রেনে সামনের অংশে যাত্রীবাহী বগি এবং পেছনের অংশে মালবাহী বগি থাকতো। কখনও কখনও ট্রেনের সামনে এবং পেছনে মালবাহী বগি থাকতো। যাত্রীবাহী বগি থাকতো মাঝখানে।

একটি স্টিম ইঞ্জিন রেল গাড়ির বহর টেনে নিয়ে যেত। স্টিম ইঞ্জিনে কাঁচা কয়লা দেওয়ার পর কালো ধোঁয়া বের হয়। ইঞ্জিনের দিকে মুখ করে বসা যাত্রীদের চোখে অনেক সময় ধোঁয়ার সঙ্গে বেরিয়ে আসা কয়লার কুচি ঢুকে যায়। চোখ কচলিয়ে, চোখের পানি ঝরিয়ে সে কয়লার কুচি থেকে মুক্তির কসরত করে যেতে হয়। কিছুক্ষণের মধ্যে কয়লা পুড়ে অঙ্গারে পরিণত হয়ে যায়। তখন সাদা ধোঁয়া বের হয় চিমনি থেকে বেশি দূর পর্যন্ত বিস্তৃত হয় না।

রেল লাইনের পাশ ধরে মাঠের ভেতর দিয়ে আনুমানিক এক শ দেড় শ মিটার দূরে দূরে মোটা মোটা থাম্বা, থাম্বার মাথায় আড়াআড়ি কয়েক সারি লোহার ফ্রেমের উপর চিনা মাটির বোতল বা ছোট কলসীর আকৃতির ইনসুলেটর। ইনসুলেটরের ভেতর দিয়ে টানা তার চলে গিয়েছিল গোয়ালন্দ ঘাট পর্যন্ত। এর উৎস কোথায় ছিল, কোথা থেকে এসেছিল আমরা জানতাম না। ওই থাম্বার গায়ে কান পাতলে শোঁ শোঁ শব্দ শোনা যেত। বাতাসের বেগ বেশি হলে শব্দ আরও জোরালো হতো। এটাও আমাদের কম বয়সে খেলার একটি অন্যতম আকর্ষণ ছিল। গোয়ালন্দে তখন টেলিফোন ছিল না। বিদ্যুৎ ছিল না।

গোয়ালন্দে টেলিফোন এসেছে ষাটের দশকের মাঝামাঝি। বিদ্যুৎ এসেছে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরে। ওই তারগুলো কিসের জন্য ছিল! তাহলে কি ‘টরে-টক্কা’ যন্ত্রের মাধ্যমে এক স্টেশন থেকে অন্য স্টেশনের মধ্যে ট্রেন চলাচল সংক্রান্ত তথ্য আদান-প্রদানের বার্তা ওই তারগুলোর ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হতো? হতেও পারে।

রেল লাইনের উপর দিয়ে ‘ট্রলি’ নামে আর এক প্রকার যান চলাচল করতো। কাঠের চোকি বা মাচার মতো গঠন। প্রস্হে রেল লাইনের চেয়ে একটু বেশি, দৈর্ঘ্যেও প্রায় একই রকম। মাচাটির উপরে একটি বেঞ্চ বসানো। বেঞ্চের যাত্রীকে ছায়ায় রাখার জন্য বেঞ্চের বরাবর উপরে বিরাট আকারের ছাতা। রেল গাড়ির চাকার চেয়ে আকারে ছোট একই রকম লোহার চাকা। চালক দু জন। এরা পেছন থেকে হ্যান্ডেল ধরে ধাক্কা দিয়ে ক্রমশ গতি বাড়িয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে এক সময় লাফ দিয়ে ট্রলির উপরে উঠে বসতো। এতেই অনেক দূর পর্যন্ত যেত। গতি কমে এলে আবার একই কায়দায় ধাক্কা দিয়ে পূর্ণ গতি এনে লাফ দিয়ে উপরে উঠে বসতো। এরা মোট চারজন থাকতো। পালাক্রমে দু জন করে ট্রলি ঠেলতো। দু জন অপেক্ষমান থাকতো। এভাবে এ যানটি বোধহয় রাজবাড়ি থেকে আসতো। আবার চলে যেত। এ ট্রলিতে রেলের বড় কর্তারা রেল লাইনের অবস্হা পরিদর্শনের কাজ করতেন। ওই ট্রলিতে ধোপদুরস্ত পোষাক পরিহিত কর্মকর্তা বা প্রধান ব্যক্তিকে, যিনি বেঞ্চের উপর বসতেন, যাঁর মাথার উপর ছাতা থাকতো, আমাদের কাছে তাঁকে মনে হতো অন্য জগতের মানুষ। আমাদের ছোটবেলায় প্রতিদিনের পরিচিত যান্ত্রিক বাহনের মধ্যে ছিল রেল গাড়ি এবং রেল লাইনের উপর দিয়ে চলাচলকারী যান্ত্রিক ট্রলি। ট্রলি যান্ত্রিক এবং অযান্ত্রিক দু রকমই ছিল। যান্ত্রিক ট্রলি দেখেছি আরও পরে। স্কুলে পড়ার সময়। ট্রলিকে আমরা বলতাম ‘টালি’ এবং যান্ত্রিক ট্রলিকে বলতাম ‘মটর টালি’।

অযান্ত্রিক বাহন: মহিষের গাড়ি এবং ঘোড়া
…………………………..
অযান্ত্রিক বাহনের মধ্যে পানিতে নৌকা। ডাঙায় মহিষের গাড়ি এবং ঘোড়া। মহিষের গাড়ি আড়তের মালামাল বহন করতো এবং হয়তো অন্য মালামালও বহন করতো। শুধু মনে আছে, দুটি মহিষ মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে মালামাল চাপিয়ে দেওয়া গাড়ি টেনে নিয়ে যেত। মহিষের গাড়ির চাকার টানা সুরের ক্যাঁকু ক্যাঁকু শব্দ আমাদের আকর্ষণ করতো। ক্যাঁকু ক্যাঁকু শব্দ কানে আসতেই আমরা দৌড়ে গিয়ে রাস্তার ধারে দাঁড়াতাম। কখনও একটি, কখনও পর পর একাধিক মহিষের গাড়ি, আমাদের সামনে দিয়ে চলে যেত। আমরা দেখে খুব আনন্দ পেতাম।

একবার মানিক নামে এক তরুণ গাড়োয়ান কেমন করে গাড়ি থেকে পড়ে গিয়েছিল এবং তার হাতের উপর দিয়ে গাড়ির চাকা চলে গিয়েছিল। মারাত্মক আহত অবস্হায় তার চিকিৎসার জন্য আইনদ্দিন ডাক্তার সাহেবকে আনা হয়েছিল। ডাক্তার সাহেব মানিকের হাতে সেলাই দিয়েছিলেন বলে অস্পষ্ট মনে পড়ে।

ঘোড়ার গাড়ি ছিল বলে মনে পড়ে না। ঘোড়া নিজেই ছিল বাহন। বড় দুটি বস্তা দড়ি দিয়ে বেঁধে ঘোড়ার পিঠের দু দিকে ঝুলিয়ে দেওয়া হতো। ঘোড়ার মালিক বা চালক হাতে একটা ছড়ি নিয়ে সঙ্গে সঙ্গে হেঁটে যেত। ঘোড়ার পিঠে আড়তের মালামাল, চুলায় জ্বাল দেওয়ার জন্য খড়ি ইত্যাদি বহন করা হতো। ছোটবেলায় আমরা গরুর গাড়ি বা গরুতে টানা গাড়ি দেখি নি। ‘মহিষ’ আমাদের উচ্চারণে ‘মইশ’ এবং ‘ঘোড়া’ আমাদের উচ্চারণে ‘গুড়া’।

নৌকা
…….
মালামাল বহনকারী নৌকা ছিল নানা প্রকার। মালামাল বহনকারী নৌকাকে বলা হতো ‘ছাঁদি নাও’। ধারণ ক্ষমতা অনুযায়ী ছাঁদি নাওয়ের আকার ছোট-বড় হতো। নাওয়ের পেছনের দিকে বাঁশের চিকন বাতার শৈল্পিক বুননে মজবুত এবং স্হায়ী ছই থাকতো। এ ছইয়ের ভেতরেই ছাঁদি নাওয়ের মাঝি-মাল্লাদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্হা থাকতো। ছইয়ের সামনের দিকে লেখা থাকতো ‘১০০ মনি’, ‘২০০ মনি’, ‘৫০০ মনি’ ইত্যাদি। বোঝান হতো, এ নৌকাটি ১০০ মন, ২০০ মন বা ৫০০ মন মাল বহন করতে পারে। এ সব ছাঁদি নাওয়ে প্রধানত পাট পরিবহনের কাজ করা হতো। ছাঁদি নাওয়ে অবশ্যই ডবল বাদাম থাকতো। বাতাসের গতি মোটামুটি হলে বাদাম তুলে ছাঁদি নাওগুলো তরতর করে এগিয়ে যেত। মাল্লারা ছইয়ের উপরে আয়েশ করে বসে গল্পগুজব করতো। পাড়ে ভিড়ার বেশ আগেই নৌকার গতিবেগ কমিয়ে আনার জন্য বাদাম নামিয়ে ফেলা হতো। তাতেও অনেক সময় তীর স্পর্শ করার মুহূর্তে গতিবেগ বেশি থাকতো। তখন মাল্লারা একসঙ্গে লগি ফেলে গতিরোধ করতো। লগিকে আমরা বলি ‘চইর’। লগি ফেলে গতিরোধ করা মাল্লাদের খুব শক্তিধর বীরপুরুষ মনে হতো। আমার অনেক সময় মনে হয়েছে বড় হয়ে ছাঁদি নাওয়ের মাল্লা হবো।

যখন বাতাস থাকতো না, উজান মুখে যেতে হতো, হাইলচ্যা (দাঁড়) বেয়ে এগুনো যেত না, তখন মাল্লারা নদীর পার ধরে গুণ টেনে অত বড় ছাঁদি নাও উজিয়ে নিয়ে যেত। মাল্লাদের শরীর বেয়ে দরদর করে ঘাম ঝরতো।

মাল্লারা ছাঁদি নাওয়ে চুক্তি ভিত্তিক শ্রমিক হিসেবে কাজ করতো। মাঝিও চুক্তি ভিত্তিক মাঝিগিরি করতো। এরা কেউ-ই নৌকার মালিক ছিল না। আর এক ধরনের মালবাহী নৌকা ছিল। সেগুলো আকারে ছাঁদি নাওয়ের চেয়ে ছোট। আকৃতিও ভিন্ন। গৃহস্হ বাড়ির নৌকার মতোও না। নৌকার প্রায় পুরোটাই ছইয়ে আবৃত। পালেরা ওই সব নৌকা ভর্তি করে মাটির হাঁড়ি, পাতিল, ঘড়া, শানকি আরও নানা প্রকার সামগ্রী নিয়ে আসতো। এ ছাড়া, আম, কাঁঠাল নিয়েও এ ধরনের নৌকা গোয়ালন্দে আসতো।

গুল্লি নাও নামে একেবারে ভিন্ন ধরনের নৌকা দেখেছি একবারই। আকারে বিশাল, আকৃতি প্রায় গোল, পানি থেকে নৌকার মাথাকাঠ অনেক উঁচুতে, ইচ্ছে করলেই কারও পক্ষে নৌকায় উঠে পড়া সম্ভব ছিল না। ওই নৌকার সাথে আর একটি ছোট নৌকা থাকতো। কারণ, মূল নৌকাটি পার পর্যন্ত পৌঁছতে পারতো না। আগেই তলা মাটিতে ঠেকে যেত। ডাঙায় নামা, বাজার-ঘাট করা ইত্যাদি কাজে ছোট নৌকাটি ব্যবহার করা হতো। ‘গুল্লি নাও’য়ের মাঝি-মাল্লারা বাঙালি ছিল কি-না জানি না। তবে, বয়স্ক যাদের দেখেছি তারা সবাই ছিল মাড়োয়ারি। মালবাহী ওই গুল্লি নাও’য়ে, আমার ধারণা, পাট ছাড়াও অন্যান্য প্রকার পণ্য সামগ্রীও বহন করা হতো। আমরা ডাঙায় দাঁড়িয়ে বিস্ময়ে বিহ্বল হয়ে নৌকার দিকে তাকিয়ে থাকতাম। মাঝি-মাল্লারা পেছনের হাল বেয়ে নিচে নেমে এসে ছোট নৌকায় উঠে কিনারে আসতো। বাজার-সদাইয়ের কাজ সেরে আবার ছোট নৌকা নিয়ে হালের সঙ্গে বেঁধে রেখে হাল বেয়ে বেয়ে নৌকায় উঠে যেত। বড়দের বলতে শুনেছি, ভেতরে নাকি ছোট ছোট ঘরের মতো ভাগ করা আছে। অনেকে পরিবার নিয়ে থাকে। আমার মনে হয়, ‘গুল্লি নাও’য়ে ভাড়ার বিনিময়ে অন্য ব্যবসায়ীদের মালামাল বহন করা হতো না। ‘গুল্লি নাও’য়ের মাড়োয়ারি মালিকরাই দেশের বড় বড় নদী বন্দরে মালামাল বেচাকেনা করতো। ওটা ছিল তাদের ব্যবসা।

স্টিম ইঞ্জিন উঠে গেছে, পাল তোলা নৌকা, এক মাল্লাই নৌকা দেখা যায় না। গত শতকের নব্বইয়ের দশক এবং তারও পরে যাদের জন্ম, তারা এ সব কিছুই দেখে নি। তাদের ধারণা লাভের জন‌্য কয়েকটি ছবি দেওয়া হলো।
১৪ নভেম্বর ২০১৭

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here