দুই দশকের গোয়ালন্দ : পর্ব-১

0
80
জালাল মিঞা

………………………………………………………………………………….
দুই দশকের গোয়ালন্দ বলতে একটি সময়-পরিসর নির্দেশ করা হয়েছে। জন্মসনদ অনুযায়ী ১৯৫৫ সালে আমার বয়স ৫ বছর। প্রকৃত বয়স আরও দুই-আড়াই বছর বেশি। ওই সময় থেকে নিজের চোখে দেখা গোয়ালন্দ এবং নিজের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা গোয়ালন্দের সব কিছু মিলেমিশে বিপুল স্মৃতির ভান্ডার গড়ে উঠেছে। ১৯৭৫ সালের পর থেকে বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক চরিত্র নতুন মোড় নিতে শুরু করেছে এবং তারও পরে দ্রুত প্রসারমান প্রযুক্তির জোয়ারে জীবন-জীবীকার ধরন ও ধারণায় আমূল পরিবর্তনের ছোঁয়া লেগেছে। শুরু হয়েছে আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটের নতুন অধ‌্যায়। এ অধ‌্যায়ে আপাতত প্রবেশ না করে স্মৃতির রাশ টেনে ধরেছি। তবে, অনিবার্য ক্ষেত্রে হয়তো এই সময় পরিসরের পেছনের কথা এসে গেছে।
সামনের কথা সামনের প্রজন্মের মেধাবী ছেলেমেয়েরা তুলে ধরবে।

গোয়ালন্দ মহকুমার জন্ম ও মৃত‌্যু
……………………………………..
গোয়ালন্দের ঐতিহাসিক তথ্যাদি খুব বেশি জানা যায় না। এখনও পর্যন্ত নথীপত্র ঘেঁটে সে সব তথ্য খুঁজে বের করার চেষ্টা করা হয় নি। সরকারীভাবে, সাংগঠনিকভাবে বা ব‌্যক্তিগত উদ‌্যোগে এই শ্রমসাধ‌্য কাজে কেউ-ই হাত দেন নি।

হালে ফরিদপুর জেলা এবং রাজবাড়ি জেলার ইতিহাস নিয়ে কিছু বই লেখা হয়েছে এবং ইন্টারনেটেও কিছু তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। এ সব উৎস থেকে জানা যায়, গোয়ালন্দ, ফরিদপুর সদর, মাদারিপুর এবং গোপালগঞ্জ – এই চারটি মহকুমা নিয়ে ফরিদপুর জেলা গঠিত হয়েছিল। গোয়ালন্দ মহকুমার অধীন চারটি থানা ছিল যথাক্রমে গোয়ালন্দ, রাজবাড়ি, পাংশা এবং বালিয়াকান্দি। বৃটিশ আমল থেকে ভারত বিভাগের পর বহু বছর পর্যন্ত গোয়ালন্দের খ্যাতি ছিল। এ খ্যাতির জন্য গোয়ালন্দের রেল ও নৌ-বন্দরের ভুমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

বৃটিশ আমল থেকে বিদ্যমান প্রশাসনিক গঠন-কাঠামো অনুযায়ী কয়েকটি থানা নিয়ে একটি মহকুমা গঠিত হতো এবং কয়েকটি মহকুমা নিয়ে একটি জেলা গঠিত হতো। এ নিয়ম স্বাধীন বাংলাদেশের আশির দশকের প্রথমার্ধ পর্যন্ত বহাল ছিল। ফরিদপুর জেলা ১৭৮৬ সালে গঠিত হলেও তখন এটির নাম ছিল জালালপুর এবং প্রধান কার্যালয় ছিল ঢাকা। ১৮০৭ সালে জালালপুর ঢাকা হতে বিভক্ত হয়ে ফরিদপুর জেলা নামে অভিহিত হয় এবং সদর দফতর স্হাপিত হয় ফরিদপুর শহরে। গোয়ালন্দ, ফরিদপুর সদর, মাদারীপুর ও গোপালগঞ্জ – এই চারটি মহকুমা সমন্বয়ে ফরিদপুর জেলা পূর্ণতা পায়। (সূত্র: সরকারি ওয়েবসাইট: www.faridpur.gov.bd/)।
১৮৭১ সালে গোয়ালন্দ মহকুমা গঠিত হলে পাংশা ও রাজবাড়ি এই নতুন মহকুমার সঙ্গে যুক্ত হয় এবং রাজবাড়িতে মহকুমা সদর দফতর স্হাপিত হয়। ১৯৮৩ সালে সরকার প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে প্রতিটি থানাকে উন্নীত থানায় রূপান্তরিত করলে রাজবাড়িকে মান উন্নীত থানা ঘোষণা করা হয়। ১৯৮৩ সালের ১৮ই জুলাই থেকে সরকার অধ্যাদেশ জারী করে সকল মান উন্নীত থানাকে উপজেলায় রূপান্তরিত করার ফলে রাজবাড়ি উপজেলা হয়। অবশেষে ১৯৮৪ সালের ১ মার্চ সকল মহকুমা জেলা হিসেবে ঘোষণা করা হয়। গোয়ালন্দ ছিল মহকুমা। সরকারী অধ্যাদেশ অনুযায়ী গোয়ালন্দ স্বাভাবিকভাবেই জেলায় উন্নীত হওয়ার কথা। কিন্তু, কিছু খোঁড়া যুক্তি বের করে রাজবাড়িকে জেলায় রূপান্তরিত করা হয়। (সূত্র: সরকারি ওয়েবসাইট: www.rajbari.gov.bd/)|

গোয়লন্দের চেয়ে রাজাবড়ি থানায় ইউনিয়ন পরিষদের সংখ‌্যা বেশি, শোনা যায়, এই যুক্তি দেখিয়ে নাকি রাজবাড়িকে জেলায় রূপান্তরিত করা হয়। কিন্তু, একটি মহকুমার সঙ্গে তো সেই মহকুমার অধীন একটি থানার তুলনা করা চলে না। তুলনা হতে পারতো রাজবাড়ি, পাংসা, বালিয়াকান্দির মধ‌্যে। কারণ, এ তিনটিই থানা। থানার সঙ্গে তুলনা হবে থানার। রাজবাড়ি, পাংসা, বালিয়াকান্দি থানাগুলো তো ছিল গোয়ালন্দ মহকুমার অধীন। কাজেই, আমাদের মতো অতি সাধারণ মানুষও পরিষ্কার বুঝতে পারে, শুধু গায়ের জোরে একটি খোঁড়া যুক্তি দাঁড় করিয়ে গোয়ালন্দকে জেলা করার ন‌্যয‌্য পাওয়ানা থেকে কুৎসিতভাবে বঞ্চিত করা হয়েছে। আমি একজন গোয়ালন্দের মানুষ হিসেবে আজও এই চাপিয়ে দেওয়া গ্লানির কষ্ট বহন করে চলেছি।
নিজস্ব বিত্ত-বৈভব, প্রাকৃতিক সম্পদ ও সৌন্দর্যের অপার ঐশ্বর্যে দেশি-বিদেশি মানুষের পার্থিব চাহিদা পূরণ করে এবং অপার্থিব আনন্দে আপ্লুত করে গোয়ালন্দ নিজের মহিমায় শত বছর আগেই মহকুমার স্বীকৃতি ও মর্যাদা লাভ করেছিল। গোয়ালন্দ ছিল প্রবল প্রমত্ত পদ্মা নদীর পাড়ে। পদ্মা নদীর পাড় ভেঙে প্রতি বছর স্টিমার ঘাট এবং রেল স্টেশনের অবস্হান পিছিয়ে আসতো। হাট-বাজার স্হানান্তরিত হয়ে যেত। ওই পরিস্হিতিতে গোয়ালন্দ মহকুমার সরকারি অফিস-আদালত রাজবাড়িতে স্হাপন করা হয় এবং দেড় শ বছরেরও বেশি সময় পর্যন্ত গোয়ালন্দ মহকুমার সকল সরকারি কাজকর্ম এবং অফিস-আদালত সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হয়।

গোয়ালন্দকে জেলা করা হলে ‘নদীর ভাঙন থেকে নিরাপদ’ কোনো অবস্হানে গোয়ালন্দ জেলা প্রশাসনের সদরদপ্তর গড়ে তোলা যেত।

গোয়ালন্দ মহকুমার সরকারি অফিস-আদালত রাজবাড়িতে স্হাপন করার সময় আসলে কেউ ভাবতে পারে নি, শিয়ালের কাছে মুরগি বর্গা দেওয়া হচ্ছে।

গোয়ালন্দ মহকুমার বয়স ও অকাল মৃত‌্যু 
…………………………………………….
ফরিদপুর জেলার ওয়েব সাইটের তথ্য অনুযায়ী ১৮০৭ সালে ফরিদপুর জেলার প্রধান কার্যালয় ফরিদপুর শহরে স্হানান্তরিত হয় এবং গোয়ালন্দ, ফরিদপুর সদর, মাদারীপুর ও গোপালগঞ্জ এই চারটি মহকুমা সমন্বয়ে ফরিদপুর জেলা পূর্ণতা পায়। সে হিসেবে ১৯৮৪ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত গোয়ালন্দ মহকুমার বয়স ছিল দীর্ঘ ১৭৬ বছর।

রাজবাড়ি জেলার ওয়েবসাইট অনুযায়ী গোয়ালন্দ মহকুমা গঠিত হয় ১৮৭১ সালে। সে হিসেবে, ১৯৮৪ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত গোয়ালন্দ মহকুমার বয়স ছিল দীর্ঘ ১১২ বছর।
যদি ধরেও নেওয়া যায়, ১৮০৭ সালে গোয়ালন্দ, ফরিদপুর সদর, মাদারীপুর ও গোপালগঞ্জ মহকুমা নিয়ে ফরিদপুর জেলা গঠিত হয় এবং গোয়ালন্দ মহকুমার দাফতরিক কাজ-কর্ম শুরু হয় ১৮৭১ সালে, তাহলে গোয়ালন্দ মহকুমার প্রারম্ভিক বয়সের গড়মিল দাঁড়ায় ৬৪ বছর। এটা একেবারেই অসম্ভব মনে হয়। কারণ, মহকুমার মতো একটি প্রশাসনিক ইউনিট গঠিত হওয়ার পরে কাজ শুরু করতে ৬৪ বছর লেগে যাওয়ার কথা নয়। এ ক্ষেত্রে প্রকৃত তথ‌্যের শূন‌্যতা রয়েছে বলে মনে হয়। এই শূন‌্যতা পূরণের জন‌্য কেউ গবেষণা করে প্রকৃত তথ‌্য উদ্ঘাটন করতে পারেন। আপাতত বলা যেতে পারে, শতাধিক বছরের পুরোনো গোয়ালন্দ মহকুমাকে ১৯৮৪ সালের ১ মার্চ জেলায় রূপান্তরিত হওয়া থেকে বঞ্চিত করা হয়। দীর্ঘ শতাধিক বছরের একটি মহকুমার পায়ের তলা থেকে উপরে ওঠার সিঁড়ি টেনে সরিয়ে ফেলা হয়।

তস্করের আকস্মিক ছুরিকাঘাতে শতায়ু গোয়ালন্দের জেলা হওয়ার ন‌্যয‌্য অধিকারের নির্মম মৃত‌্যু ঘটে। এই আকস্মিক অকাল মৃত‌্যুর পেছনে সক্রিয় আততায়ীদের আসামীদের কাঠগড়ায় দাঁড় করাবে কে!?
………………………………………
বিশেষ দ্রষ্টব‌্য: 
১. বর্তমান পর্বের লেখায় আমার স্মৃতির ভান্ডারে হাত পড়ে নি। নিজস্ব দু চারটি মন্ত‌ব‌্য ছাড়া সবই সরকারী সূত্রের তথ‌্য।

২. আমার ফেসবুক বন্ধুদের অনেকেই এই ধারাবাহিক লেখাটি পড়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছন। তাঁরা গোয়ালন্দ ফাউন্ডেশন পেজের সদস‌্য নন। আবার, গোয়ালন্দ ফাউন্ডেশনের অনেকেই আছেন, আমার ফেসবুক বন্ধু নন। কাজেই, আমার টাইম লাইনে এবং গোয়ালন্দ ফাউন্ডেশন পেজে একইসঙ্গে লেখাগুলো পোস্ট করছি।
………………………………………..
শুক্রবার
১০ নভেম্বর ২০১৭

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here