পিতার প্রতি পুত্রীর দায়

0
812

ওম লায়েস ॥
সদ্য ভাষার মাস পেরুলাম। ভাষা অন্য জাতি বা অন্য দেশের জন্য কতখানি তা আমার জানা নেই। শৈশব-কৈশরে বাংলা উচ্চারন এদিক- সেদিক করলেই আমার শিক্ষয়েত্রী মায়ের হাতে মার খেতে হত। বাবার কাছে বিচার দিয়ে লাভ নেই। তাঁর মতে যে ভাষার দাবীতে প্রাণ দিতে হয়েছে, যে ভাষাকে অর্জন করতে হয়েছে-সেই ভাষার যেমন তেমন ব্যবহার তো শহীদান দের আত্মার প্রতি অমর্যাদা। সুতরাং ভাষাকে শুদ্ধ উচ্চারণ ও সুষ্ঠ ব্যবহার বাঞ্চনীয়। বিচার শেষ। ব্রিটিশ ভারতে অনেক আন্দোলন সংগ্রাম হয়েছে। আজও বিশে^র নানা দেশে আন্দোলন সংগ্রাম হচ্ছে-হবে। কিন্তু তা থেকে আমাদের ভাষা আন্দোলনটা ভিন্ন। কারন এটাই বিশে^র প্রথম কোন জাতি যাঁরা ভাষার দাবিতে পথে নেমেছে। কেবল পথেই নামেনি পরাশক্তিকে বাধ্য করেছে বাংলা কে ‘রাষ্ট্রভাষা’ করতে। এটা যেমন সফল আন্দোলন তেমনি নিরীহ বাঙালী তাঁদের আত্মশক্তির পরিচয় জেনেছে। জেনেছে উদাস বাঙালীর ক্ষমতা না হলে চলে কিন্তু মর্যাদা আর ভাষা না হলে চলে না।
ভাষা আন্দোলন আমাদের মর্যাদার লড়াই আর তার বিজয় আমাদের স্বাধীকারের ‘বীজমন্ত্র’ তাই অমর ২১শে বাঙালীর কাছে সর্বদাই ভিন্ন আবেদনের আর অপশক্তির কাছে আতংকের। আমাদের গাঁয়ে মুখরা রমনীদের সব থেকে বেশী উচ্চারীত কথা হলো ‘উপরে ফিট-ফাট ভেতরে সদর ঘাট।’ ‘সদর ঘাট’ বলতে নদীর ঘাটকে বোঝায়। মুলত অন্তঃসার শূণ্যতা বা চরিত্রহীনতাকে বোঝায়। ফেব্রুয়ারী এলেই বাংলা গেল গেল রব তুলে কলম শূন্য করে ফেলি। সারা বছর কোন খোঁজ রাখি না। দল ক্ষমতায় থাকলে তো ‘সন’ টা ও মনে রাখার প্রয়োজন হয় না। সে—সব—পরে!!!

জাতিসংঘে বাংলা ফ্রন্ট চালু হলেও স¦াধীনতার এত বছর পরেও সরকারী থেকে বেসরকারী অফিস- আদালতে সর্বত্র প্রধান ভাষা আজও ইংরেজী, দেশের উচ্চ আদালতে তো বাংলা অচ্ছুত। একটি ভাষা বেঁচে থাকে তার ব্যবহারে এবং সমৃদ্ধ হয় রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায়। ব্যবহারের কথা কি বলব বাংরাজী না হলে তো আমাদের বেসরকারী রেডিও-ই চলবে না। আর বিজ্ঞাপন বলি আর তরুণদের উচ্চারণ বা তারুণ্য ধরে রাখতে আমরা কেউ কেউ কথার কি ছি! রি!!
সমস্ত পাঠ্য বই, গাইডবই বা অন্যান্য যেন ভুলের বহর বয়ে যায়। ব্যাঙের ছাতার মত গজিয়ে উঠা বেসরকারী বিশ^বিদ্যালয়, কিন্ডার গার্টেন নামের প্রতিষ্ঠানে তো বাংলার কোন অস্তিত্ব-ই নেই। যা-ও আছে তা-ও ভুলে ভরা। এখানে ছাত্র-ছাত্রীদের সীট দেওয়া হয় আর গ্রেডিং দেওয়া হয় টাকার বিনিময়ে। শিক্ষা অর্জন হয় কতটুকু তা-তো এদের ভেদ- বুদ্ধি আর চাল-চলনেই বোঝা যায়। তবুও আমাদের মাননীয়া প্রধানমন্ত্রী এ ব্যাপারে যথেষ্ট সোচ্চার। যদিও টানা দুই কিস্তি প্রধানমন্ত্রীত্ব শেষ করে তৃতীয় বারের মত ক্ষমতায়। আমি তাঁর যথাযথ সম্মান রেখেই আমার হৃদয়ের অতলান্তের ভালবাসা মেখেই প্রস্তাবনায় যাচ্ছি- হে মা-জননী আপনার উপস্থিতিতেও আজ কেন এ দশা বাংলার কেন এত অবহেলা বাংলা ভাষার। এই বাংলার মানুষের জন্য আজীবন সংগ্রাম করেছেন আপনার বাবা। যিনি সবার পিতা হয়ে উঠেছেন বা তার চেয়েও বেশী কিছু- বাঙালীর স্বপ্নপুরুষ তিনি। তাঁর স্বপ্ন পূরণে বাংলার আম জনতা প্রাণ দিতে কুন্ঠিত হয়নি। তিনি যখন পাকিস্থানের কারাগারে তখন অনেক মা-বোনেরা তাঁর মুক্তির জন্য রোজা রেখেছেন। আমার বুবুনানী(আমার নানু ভাই- এর বোন। যিনি ছিলেন বাল্য বিধবা। ভীষণ পর্দানশীলা বলা যায় অসূর্যস্পর্শী।) যতদিন বঙ্গবন্ধু দেশে ফেরেননি ততদিন রোজা রেখেছেন। দেশ স্বাধীন হলেও, তাঁর ভাই ভাতিজা,ভাগ্নে ঘরে ফিরলেও নেতা দেশে পা রাখেননি যতক্ষণ ততক্ষণ স্বাধীনতা মূল্যহীন তাঁর কাছে। এমনটা অনেকে করেছেন। সাত কোটি বাঙালীর একটি নাম একটিই লক্ষ- বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান-তাঁর স্বপ্নের স্বাধীন বাংলাদেশ। আমার বাবা মৃত্যু শয্যায় শুয়েও টিভিতে আপনার মুখ ভেসে উঠলেই বলেছেন আ-হা আমার বোনটা শুকিয়ে গেছে। আরেকটি বছর বেঁচে থাকলে আমার বোনের নির্বাচনটা করে যেতাম। নির্বাচনের সময় বাবাকে নিয়ে টানাটানি পরে যেত। তাঁর বক্তব্যে জনগন মোহিত হয়ে যেত। তাঁর প্রথম যৌবন থেকে অর্থাৎ ’৬৯ এর নির্বাচন থেকে দশম সংসদীয় নির্বাচন পর্যন্ত। বঙ্গবন্ধুকে বাঙালী আজও ভালবাসে তেমন করেই। তাঁর হয়ে আপনাকেও। বিশেষত তাঁর স্বপ্ন পূরণে সফল সিঁড়ি ভাবি।
তাঁর জন্ম শতবার্ষিকী উপলক্ষে ‘মুজিব বর্ষ’ ঘোষিত হতে চলেছে। নানা জনে নানা রঙে, নানা বর্ণে উদযাপিত হবে এ বর্ষ। কেও ভালবেসে হৃদয় থেকে, কেউবা ফায়দা তুলতে। আপনাকে তা বুঝে নিতে হবে। পিতা প্রতিটি কন্যার জীবণে ভীষণ তুলতুলে- যেখানে বিচার বিশ্লেষণ চলে না। তবে স্বপ্ন বাস্তবায়নের বিজয় রথ- তো চলতে পারে। সফল শাসক হিসাবে তাঁর স্বপ্নের বাংলাদেশকে তো আমরা পেতে পারি। উন্নয়নের জোয়ারের সাথে যত জুয়ারীকে ধরেছেন তা দেখে মনে আশা জাগে। সত্যি বুঝি এবার বাংলার মুক্তি ঘটবে- অপভাষা আর অপরাজনীতির নামে দূর্ণীতি থেকে। মা-গো আমাদের দেশটা অনেক সুন্দর। এই সমুদ্রকণ্যা বাংলাদেশের মানুষগুলোও অনেক ভালো। অথৈ সাগরের মতই অতল হৃদয় সবার। নিত্য প্রয়োজন আর নিরাপত্তা পেলে আর কিছুতেই মাথা ঘামায় না। তাই এদের ভয় নেই। ভয় কেবল দূর্ণীতিবাজদের যাদের ক্ষুধা অসীম যারা দেশের অর্থনীতি ভেঙ্গে বিদেশে টাকা জমায় বা নিজের ঘরকেই টাকার খনি বানায়। এদের সংখ্যা খুব বেশি নয়। ছোট্ট এই দেশটাই আপনি চোখ রাখলেই তা দেখতে পাবেন। তাদের ছত্রধারী আপনার আশেপাশেই আছে। এদেরকে কেবল আপনিই রুখতে পারেন। পিতার প্রথম কন্যা হিসেবে ইতিহাসের দেশপ্রেমিকদের দৃঢ়তার নির্যাস আপনার কাছে অমৃতসম রক্ষিত। পাকিস্থানের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠা বাঙালীর স্মারক বঙ্গবন্ধুর নিত্য যন্ত্রনা আপনি কাছ থেকে দেখেছেন। মাকে দেখেছেন সংসার ঠেলে ঠেলেও হাসিমুখে পিতার শক্তি হয়ে উঠতে। ব্রিটিশকে তাড়ানো হুংকার, অতবড় সেনাশাসককে উৎখাত এ তো কেবল বাঙালীই পারে। সেখানে আপনি ক্ষমতায় থেকে গুটিকয়েক বহুরুপী বর্ণচোরদের রুখতে পারবেন না? তা কি হয়? তাই আমার মিনতি ‘মুজিববর্ষ’-এ পুরিত হোক মুজিব স্বপ্ন- শোষনহীন, দুর্ণীতিহীন, ক্সবষম্যহীন ক্ষুধা ও দারিদ্রমুক্ত অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের আর আমাদের বাংলা রাষ্ট্রীয় পরিচর্যায় স্ব- আসনে স্ব-মহিমায় আসীন হোক সর্বস্তরে-সবখানে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here