চিকিৎসকরা কি এই প্রথম “ফ্রন্টলাইনার” হলেন?

0
767

চিকিৎসকরা কি এই প্রথম ফ্রন্টলাইনার হলেন?

চিকিৎসকরা সর্বদাই ফ্রন্টলাইনার!

ছিলেন, আছেন এবং ‘এই’ দেশে থাকবেনই!

১। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। বিসিএস কর্মকর্তা হিসেবে চিকিৎসকদের প্রথম পদায়ন হয় এই ৩১/৫০ বেডের হাসপাতালে। আমিও লাফিয়ে লাফিয়ে গিয়ে যোগদান করলাম। হাসপাতাল শ’ তিনেক রোগী আসতো আউটডোরে। কেউ আসতো রোগের কারনে। অধিকাংশ মানুষ আসতো সরকারী ঔষধের জমা থেকে নিজের ‘ভাগ’টা বুঝে নিতে।

চিকিৎসক হিসেবে আমাদের কাজ ছিলো স্লিপ লিখে লিখে ‘জনগণের ভাগ’ বুঝিয়ে দেওয়া। প্রথমদিকে অনেক চেষ্টা করেছি আমরা, যাতে করে অপ্রয়োজনীয় ঔষধ বিতরণ ঠেকানো যায়। স্থানীয়দের চাপে সেটা আর করা যায়নি।

কারন অনেকে হাসপাতালে এসে রোগের লক্ষণ না বলে ঔষধের নাম বলতো।

“দুই পাতা গ্যাসের বড়ি দেন”

“এক পাতা মেট্রো দেন”

“ভালো এক পাতা প্রেসারের অষুদ দেন”… এক রোগী আমার রুমে এসেছিলো মেট্রো নিতে। তার মুরগীকে খাওয়াবে। কারন তার মুরগীর পায়খানা ভালো হয় না!

এভাবে স্থানীয়দের কথায় যখন ডিসপেন্সিং চলতো,তখন হাসপাতাল এর ঔষধ ফুরিয়ে যাওয়াই স্বাভাবিক। কাঙ্খিত ঔষধ না পেলে এই স্থানীয়রাই ‘স্থানীয়’ ভাষায় চিকিৎসকদের যখন তুলোধনা করতো, সেই অরাজকতার রাজ্যে চিকিৎসকরা কি ফ্রন্টলাইনার ছিলেন না?

২। দুপুর ২ টার পর, মানে অফিস সময়ের পর যখন একটা সাধারণ ইসিজি করানো যেতো না উপজেলার সেই হাসপাতালে, তখন বুকে ব্যাথার রোগী কিংবা সত্যিকারের কার্ডিয়াক রোগীকে  জেলার হাসপাতালে রেফার্ড করা লাগতো। তখন রোগীর স্বজনদের জনরোষ এর মহাসমুদ্রে চিকিৎসকরা কি  ফ্রন্টলাইনার ছিলেন না?

৩। স্থানীয় দুই পক্ষ মারামারি করে হতাহত হয়ে যখন হাসপাতালে আসতো, তখন সাথে আসতো আরো জনা পঞ্চাশেক শুভানুধ্যায়ী সমর্থক। সেই রক্তচক্ষু মানুষগুলোর মধ্যে দাঁড়িয়ে আহত মানুষটাকে চিকিৎসা করার মতো অতি দুরূহ কাজে চিকিৎসকরা কি ফ্রন্টলাইনার ছিলেন না?

৪। উপজেলা হাসপাতালে রাউন্ডের সময় সাধারণ রোগী থেকে শুরু করে পাতি নেতাদের নানামুখী প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয় “আপনারা বাথরুম পরিষ্কার করেন না ক্যান?” “আপনাদের খাবার এতো বাজে ক্যান?” “আপনাদের হাসপাতালে স্যালাইন নাই ক্যান?” “এই রোগীর অপারেশন করতে জেলায় যাওয়া লাগবে ক্যান?” “আপনাদের কেবিন ফাঁকা নাই ক্যান?” “রক্তের সব পরীক্ষা আপনাদের হাসপাতালে হবে না ক্যান” “আপনাদের ওয়ার্ডে/সিঁড়িতে পানের পিক ফেলা থাকে ক্যান?” “সরকারী হাসপাতালে পরীক্ষানিরীক্ষা ফ্রী হয় না ক্যান?” এই সব প্রশ্নের উত্তর, যে বিষয়গুলোর সাথে চিকিৎসকদের আদতে কোন সম্পর্কই নাই, সেগুলোর জবাব একজন চিকিৎসককেই দিয়ে আসতে হয়। জনগণের এই প্রশ্নগুলোর মুখে চিকিৎসকরা কি ফ্রন্টলাইনার নন?

৫। আমার উপজেলা হাসপাতাল থেকে চিকিৎসক বদলী হতে হতে ১০ জন চিকিৎসক থেকে ৫ জন, ৫ জন থেকে ৩ জন, এমনকি ৩ জন থেকে শেষ অবদি ১ জনে দাঁড়িয়েছিলো। ১ লক্ষ ৩৮ হাজার মানুষের জন্য যেদিন হাসপাতালে মাত্র ১ জন চিকিৎসক ছিলো, সেদিন এই প্রহসনের ফ্রন্টলাইনার কি সেই একজন চিকিৎসকই ছিলেন না?

৬। বছরের পর বছর জেলা-উপজেলার হাসপাতাল গুলোতে চিকিৎসক সংকট, নার্স সংকট, হাসপাতালে অন্যান্য কর্মচার সংকট বিরাজমান। এরপরো স্বাস্থ্যসেবায় আমাদের অর্জন বিশ্বে মডেল ধরা হয়! দেশ পুরষ্কার নেয় স্বাস্থ্যসেবায় এগিয়ে যাবার জন্য। এরপর যখন কোন অঘটন ঘটে ‘একজন’ চিকিৎসক কিংবা ‘একজন’ সেবিকাকেই দায়ী করা হয়। একটি রাষ্ট্র বা একটি সিস্টেমের ব্যর্থতার যে দায়, সেই দায়ের ফ্রন্টলাইনার তাহলে কে হলো?

৭। ‘হলুদ’ কিংবা সাদা গণমাধ্যমের মুখোমুখি ফ্রন্টলাইনার কে থাকেন?

কোভিড-১৯ এর বৈশ্বিক মহামারীর এই দুঃসময়ে একটি জাতি কি নতুন করে জানলো যে চিকিৎসকরা “ফ্রন্টলাইনার”?

অথচ জাতি জানলোই না বা জাতিকে জানতেই দেওয়া হলো না, স্বাস্থ্যখাতের সকল অব্যবস্থাপনার যে মাশুল একটি জাতিকে দিতে হয়, তার প্রায়াশ্চিত্তের “ফ্রন্টলাইনার” একজন চিকিৎসক এবং শুধুমাত্র একজন চিকিৎসক।

আগের দিনে শুনতাম “ডাক্তাররা গ্রামে থাকে না”

এখন শুনি “ডাক্তাররা জনগণের ট্যাক্সের টাকায় ডাক্তার হয়”

পেশাগত জীঘাংসার এমন “ফ্রন্ট + লাইন”

অন্য কোন দেশের অন্য কোন জাতির চিকিৎসকরা শোনেন কি না,

জানতে খুব ইচ্ছে হয়!

======================
ডাঃ রাজীব দে সরকার
চিকিৎসক ও কলামিস্ট
রেজিস্ট্রার, সার্জারী বিভাগ,  শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
আহবায়ক, সুহৃদ সমাবেশ, গোয়ালন্দ
ইমেইলঃ rds@mis.dghs.gov.bd

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here