জন্মের দিনে হচ্ছে না শিশুর জন্মতারিখ!

0
165

মেহেদী হাসান মাসুদ ॥
সন্তান প্রসবের দিনে নেই অনেক শিশুর জন্মতারিখ। এছাড়াও সাধারণ অভিভাবক ও চাকুরিজীবী মায়েদের সন্তানের জন্মতারিখ পরিবর্তন করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
তবে অভিযুক্তরা বিষয়টি মানতে নারাজ। তারা বলছেন ছুটিকালীন সময়ের মধ্যে কারো কারো সন্তানদের জন্মতারিখ না থাকায় হয়ত বিষয়টি ভিন্নভাবে দেখা হচ্ছে। সাধারণ অভিভাবকদের দাবী, চাকরিতে প্রবেশে বয়সের বার থাকায় ভবিষ্যতের কথা ভেবেই এমন সিদ্ধান্ত।
মা ও শিশুর স্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা করে ২০১১ সালে সরকার পূর্ণ বেতনসহ ছয়মাস মাতৃত্বকালীন ছুটির বিধান চালু করে। এর আগে ১৯৯৮ সালে মাতৃত্বকালীন ছুটি তিন মাস থেকে বাড়িয়ে চার মাস করা হয়েছিল। তবে চাকরি জীবনে একজন নারী সর্বোচ্চ দু’বার এ ছুটি ভোগ করতে পারবেন বলে পরিপত্র সূত্রে জানা যায়। একজন সরকারি চাকরিজীবী বিধি মোতাবেক তার এক সন্তানের ৫শ টাকা এবং দুই সন্তানের জন্য ১ হাজার টাকা শিক্ষা ভাতা হিসাবে পেয়ে থাকেন। অন্যদিকে সন্তান জন্মের পর শর্তপূরণে একজন সাধারণ নারী মাতৃত্বকালীন ভাতা পেতে পারেন মহিলা বিষয়ক দপ্তর কর্তৃক।
রাজবাড়ী জেলাসহ দেশের কয়েকটি উপজেলা নিয়ে এমন অনুসন্ধান ও তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সরকারি চাকরি করেন এমন নারীরা সন্তান প্রসবের সম্ভাব্য তারিখ উল্লেখপূর্বক সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে ৬ মাসের ছুটির আবেদন করেন। পরবর্তীতে তারা ছুটি ভোগের পাশাপাশি সরকার কর্তৃক সকল সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেন। গত কয়েক বছরে মাতৃত্বকালীন ছুটি ভোগ করেছেন এমন কয়েকশ’ নারীর ছুটির শুরু-শেষ তারিখ ও তাদের সন্তানদের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। তাতে দেখা যায়, প্রায় ২০ শতাংশ নারী উল্লেখিত তারিখের মধ্যে (মাতৃত্বকালীন ছুটি সময়ে) তাদের কোনো সন্তানের জন্ম তারিখ রাখেননি!
অপরদিকে ২০১৩-১৫ সালে প্রাক-প্রাথমিক/প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছে এবং ২০১৮-২০১৯ সালে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা দিয়েছে, এমন তথ্যও বিশ্লেষণ করা হয়। সাধারণ অভিভাবকদের অনেকেই তাদের সন্তানকে প্রাক-প্রাথমিক কিংবা প্রথম শ্রেণিতে ভর্তিতে যে জন্মতারিখ ব্যবহার করেছেন, পরবর্তীতে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনীতে সে জন্ম তারিখ ব্যবহার করেননি। সে সময়ে তারা জন্মনিবন্ধন সনদ দিয়েছেন, যেটিতে বয়স ভিন্ন বলে অভিযোগ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের। তবে এর হার উল্লেখ্যযোগ্য।
শুধু তাই নয় আইন অনুযায়ী শিশুর জন্মের ৪৫ দিনের মধ্যে জন্মনিবন্ধন বাধ্যতামূলক থাকলেও সেটি কাগজে কলমেই সীমাবদ্ধ। সম্প্রতি উপবৃত্তিতে জন্মসনদের নম্বর চাওয়ায় আগে-ভাগেই করতে হচ্ছে জন্মসনদ। এর আগে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অনেকেই ভুয়া জন্মতারিখ দিয়ে থাকেন। কেউ কৌশলে ইপিআই কার্ড সংগ্রহ করে কিংবা কার্ড ঘষামাজা করে ইচ্ছেমত তারিখ দিয়ে করে থাকে গুরুত্বপূর্ণ জন্মনিবন্ধন সনদ। কোন কোন অভিভাবক সন্তানের জন্য একাধিক জন্মসনদ করে থাকেন বলেও অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। সম্প্রতি অনেকেই সন্তানদের বয়সের কারণে সরকারি মাধ্যমিকে ভর্তিতে হ-য-ব-র-ল অবস্থায় পড়ে।
অভিযোগ প্রসঙ্গে সরকারি চাকরি করেন এমন একাধিক নারী বলেন, ‘সন্তান প্রসবের পূর্বে তারা বিধি মোতাবেক ছুটি নিয়েছেন এবং মাতৃত্বকালীন ছুটি ভোগ করেছেন। সরকারি যাবতীয় সুবিধা গ্রহণ করেছেন। সে সময়ে সন্তানও হয়েছে। তবে সন্তানের বয়সটি আসলে সেভাবে মিলিয়ে দেখেননি। মূলত সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভেবেই এমনটি করা হয়েছে। তবে বিষয়টি অনৈতিক বলে তারা স্বীকার করেছেন।
নাম না প্রকাশ করার শর্তে একাধিক অভিভাবক বলেন, সন্তানের লেখাপড়া শেষ করে চাকরি পাওয়া নিয়ে দু:চিন্তায় পরতে হয়। বয়স কমিয়ে দিলে চাকরিযুদ্ধের সময়টা বেশি পাওয়া যায়। মূলত সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভেবেই অনেক অভিভাবক বয়স কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন ।
জানতে চাইলে রাজবাড়ী জেলা প্রশাসক দিলসাদ বেগম বলেন, ‘এধরনের কাজ করা অনৈতিক। চাকুরিজীবী নারী ছাড়া অনেকে গৃহিনীরাও প্রকৃত জন্মতারিখ বদলিয়ে দেন। আর মার্তৃত্বকালীন ছুটি দেওয়ার পরে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টি আর নজরে রাখে না। নিয়ম সন্তান জন্মেও ৪৫দিনের মধ্যে জন্মনিবন্ধন করতে হবে। এবিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।’
স্থানীয় সরকার বিভাগের রেজিষ্ট্রার জেনারেল (অতিরিক্ত সচিব) মানিক লাল বণিক বলেন, জন্মনিবন্ধন সনদে বয়স কম-বেশি করা অনৈতিক। তাছাড়া একাধিক জননিবন্ধন তৈরি করাও অপরাধ। আমাদের সফটওয়্যার আপগ্রেড করে সেটা ধরা হচ্ছে। মাঠ পর্যায়ে যারা নিবন্ধনের কাজ করে থাকেন তাদের কঠোর নির্দেশনা দেয়া রয়েছে যাচাই-বাছাই পূর্বক জন্মনিবন্ধন সনদ প্রস্ততে। নিয়ম অনুযায়ী ৪৫ দিনের মধ্যে শিশুর জন্মনিবন্ধন সম্পন্ন করা যায় সেবিষয়ে সভা-সেমিনারসহ বিভিন্ন উপায়ে আমরা জোর চেষ্টা করছি।
এ বিষয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিব শেখ ইউসুফ হারুন বলেন, ‘মাতৃত্বকালীন ছুটি চলাকালীন সময়ের মধ্যে সন্তানদের জন্ম হয়, কিন্তু সে যদি ছুটি চলাকালীন সময়ের মধ্যে তার সন্তানদের বয়সটি না রাখে, সে পরবর্তী পর্যায়ে সেটি মিথ্যা তথ্য দাখিলের জন্য দায়বদ্ধ হবেন। যেকোনো ব্যক্তির বয়স কম-বেশি করা গুরুতর অপরাধ। এটির জন্য আলাদা আইন রয়েছে, শাস্তির বিধানও রয়েছে। তদন্ত সাপেক্ষে দোষীদের বিরুদ্ধে উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।’

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here