“আল-জাজিরা চ্যানেলকে ধন্যবাদ”

0
940
আমি আসলে আল-জাজিরা ইস্যু নিয়ে নতুন করে কিছু লিখতে চাচ্ছি না।
বরং একটা গল্প বলি…
এক কৃষক এর ছেলেকে চুরির অভিযোগে দায়ে ধরে নিয়ে জেলে পুরে রেখেছে থানার পুলিশ।
এদিকে কৃষক বহু চেষ্টা করেও তার ছেলেকে পুলিশের কাছ থেকে ছাড়াতে পারলো না। অন্যদিকে কৃষকের ক্ষেতে ধান লাগানোর সময় হয়ে গেছে। কৃষক পড়লো মহাবিপদে। কারন বাপ-বেটা মিলে একসাথেই তারা ক্ষেতে কাজ করে। একা একা এই পুরো ক্ষেতে কাজ করা প্রায় অসম্ভব তার পক্ষে।
কৃষক থানা হাজতে গেলো ছেলের সাথে দেখা করতে।
ছেলেটা বাবার হাতে লুকিয়ে একটা চিরকুট দিলো। কিন্তু বিধি বাম, চিরকুট হাতে নেবার সাথে সাথেই পুলিশের একজন সেটা দেখে ফেললো।
কৃষকের হাত থেকে চিরকুট নিয়ে নেওয়া হলো।
তাতে লেখা ছিলো, “আমাদের ক্ষেতের দিকে রাত-দিন খেয়াল রেখো। স্বর্ণালংকার গুলো কেউ যেন খুঁজে না পায়”
ব্যস, আর যায় কই! গোটা থানার সব পুলিশ কৃষককে নিয়ে তার ক্ষেতে চলে গেলো। পুরো ক্ষেতে নেমে গেলো পুলিশের দল। যোগ দিলো গ্রামের কিছু লোকজনও। চুরির জিনিস খুঁজতে পুরো ক্ষেত চষে ফেললো তারা।
কিন্তু কোন সোনা-দানা খুঁজে পাওয়া গেলো না।
পরের দিন কৃষক আবার এলো থানায়। ছেলের সাথে দেখা করলো।
ছেলে আবার আরেকটি চিরিকুট দিলো বাবার হাতে।
তাতে লেখা ছিলো, “দূর থেকে যতোটা পারলাম, ক্ষেতের কাজে তোমাকে সাহায্য করলাম। বাকিটা তুমি করে নিও বাবা”
আল-জাজিরাকে আমি আসলে একটা ধন্যবাদ জানাতে চাই।
আমাদের অজান্তে হলেও আল-জাজিরা আমাদেরকে একটা আয়নার সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে। জাতি হিসেবে আমরা আসলেই আত্নমর্যাদাহীন কপর্দক এবং অসৎ। জাতিগত দৈন্যতা খুঁড়ে তুলে এনে আমাদের সামনে দেখিয়ে দিয়েছে আল-জাজিরার মিথ্যা ডকুমেন্টারি।
আল-জাজিরার জন্য আমাদের এতো “প্রেম” কেন? এমনি তো আমাদের দেশের সাংবাদিকরা একটা ভূয়া নিউজ করলে আমরা ঝাঁপিয়ে পড়ি। হাজারটা রোগী বাঁচানোর পরে একটা রোগী মারা গেলে ডাক্তার পিটাতে আমাদের হাত এতোটুকু কাঁপে না।
তাহলে আল-জাজিরা এই জাতিভিত্তিক মিথ্যাচারে আমরা কেন সামগ্রিকভাবে প্রতিবাদ জানালাম না? কেন কেউ কেউ মনে করছি আল-জাজিরার বক্তব্যে সত্যতা থাকলেও থাকতে পারে?
এর কারন কি আল-জাজিরার গায়ে সৌদি-আরবের ঘ্রাণ থাকা? এর কারন কি আল-জাজিরার সাইটে আরবী হরফ থাকা? এর কারন কি বাঙ্গালী জাতিসত্ত্বার প্রতি না, বরং ধর্মীয় অন্ধত্বের প্রতি আমাদের দুর্নিবার মাথা নুইয়ে রাখা?
আল-জাজিরা কে সমালোচনা করে লাভ নেই।
আমাদের বাগানের মধ্যেই যে বরাহ শাবকের খোঁয়াড় গড়ে তুলছি, বাগানটা নষ্ট হয়ে পুরোটা খোঁয়াড় হয়ে গেলে টিকতে পারবেন তো?
আল-জাজিরা সিনেম্যাটোগ্রাফী, সিজি, স্ক্রিপটিং টিমকে ধন্যবাদ জানাই। আমাদের বাগানে থাকা বরাহের দলকে চিনিয়ে দিয়ে যাবার জন্য। একজন বাঙ্গালী হিসেবে একজন বাংলাদেশী হিসেবে আপনাদের এই উপকার মনে রাখবো।
রাস্তায়, পথে ঘাটে, ফুটপাথে, হাসপাতালে প্রতিদিন অল্প অল্প করে আল-জাজিরার থেকেও ভয়াবহ বরাহ শাবকদের সাথে মিথস্ক্রিয়া হয়। এদেরকে স্বাস্থ্যবিধি মানানো যায় না, এদেরকে মাস্ক পড়া শেখানো যায় না। ভ্যাকসিন নিয়ে গুজব ছড়িয়ে এরা অমৃত যৌনসুখ অনুভব করে। এরা প্রভুভক্ত চতুষ্পদের মতো গোগ্রাসে ‘গু’জব ভক্ষণ করে অনলাইন নোংরা করে। এরাই ডাক্তার মারে, হাসপাতাল ভাঙচুর করে। ৩০ লক্ষ শহীদের সংখ্যা নিয়ে এরা সন্দেহ প্রকাশ করে!
অবাক বিস্ময়ে একটা মানচিত্রের দিকে তাকাই।
ওর নাম বাংলাদেশ।
অথচ এতো ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত এই সমভূমিতে একটা মৌলিক জিনিস থাকবার কথা ছিলো। আমরা যে যাই করি, ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গ-পেশা-রাজনৈতিক অন্ধত্ব/পক্ষপাত নির্বিশেষে আমরা একটা বিন্দুতে এসে মিলবো। একটা কোড। একটা সিগনাল। একটা রুট।
“কোড বাংলাদেশ”
বাংলাদেশকে নিয়ে কোন ষড়যন্ত্র হলে স্পব ভুলে আমরা সবাই এক দল হয়ে যাবো। রাজপথ কিংবা অনলাইন, আমরা আমাদের দেশ নিয়ে কোন মিথ্যাচার সইবো না। এটাই হবার কথা ছিলো। এটা হয় নাই। ৫০ বছরেও হয় নাই।
আল-জাজিরাকে ধন্যবাদ।
মুক্তিযুদ্ধ করে পাওয়া দেশের মানুষকে তোমরা বুঝিয়ে দিয়েছো “আমরা আর কোনদিন মুক্তিযুদ্ধ করতে পারবো না”
লেখাঃ
ডাঃ রাজীব দে সরকার
রেজিস্ট্রার, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here