1. jitsolution24@gmail.com : Rajbaribd desk : Rajbaribd desk
রবিবার, ০৪ ডিসেম্বর ২০২২, ০৬:২৮ অপরাহ্ন
Title :
বালিয়াকান্দিতে ৭ মামলার আসামী ৫১০ পিস ইয়াবাসহ গ্রেফতার পাংশায় কৃষকদের মাঝে বিনামূল্যে বীজ ও সার বিতরণ রাজবাড়ীতে যুবলীগের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান মনি’র জন্মবার্ষিকী পালিত রাজাকারের তালিকা প্রকাশ ও সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের দাবিতে রাজবাড়ীতে মানববন্ধন পুনরায় রাজবাড়ী জেলা জাপার সভাপতি বাচ্চু, সম্পাদক মমিন রাজবাড়ীতে পুলিশের ভুয়া এসআই আটক রাজবাড়ীতে মহিলা পরিষদের সাংবাদিক সম্মেলন স্বেচ্ছাসেবক লীগ রাজবাড়ী সদর ও পৌর কমিটি ঘোষনা করায় আনন্দ শোভাযাত্রা আগামীতে একক ভাবে নির্বাচন করবে জাতীয় পার্টি -জাপার মহাসচিব চুন্নু পাংশায় ছাত্রলীগ-যুবলীগের মিছিলে বোমা হামলা, আহত-২

৯৬ বছর বয়সেও বই নিয়ে বাড়ি বাড়ি ছুটছেন যে আলোর দিশারী!

Reporter Name
  • Update Time : বুধবার, ১৫ নভেম্বর, ২০১৭
  • ১০০৬ Time View

প্রতিদিন সকালে ঝোলাভরা বই কাঁধে গ্রামের পথে হাঁটতে শুরু করেন পলান সরকার। উদ্দেশ্য—মানুষকে বই পড়ানো। একদিন-দুদিন নয়, গত ৩০ বছর ধরে এভাবেই প্রতিদিন পায়ে হেঁটে রাজশাহীর প্রায় ২০টি গ্রাম জুড়ে বই পড়ার এক অভিনব আন্দোলনের জন্ম দিয়েছেন তিনি।

তার বয়স ৯৪ বছর। কিন্তু ৩০ বছর বয়সী যুবকের মত সচল কর্মদীপ্ত তার পা দুটো টেনে প্রতিদিন মাইলের পর মাইল হেঁটে একেকদিন একেক গ্রামে যান। নিজের টাকায় বই কিনে তিনি পড়তে দেন পিছিয়ে পড়া গ্রামের মানুষকে। আর বাড়ি বাড়ি কড়া নেড়ে আগের সপ্তাহের বই ফেরত নিয়ে নতুন বই পড়তে দেন। এভাবেই তিনি এলাকাবাসীর কাছে তিনি পরিচিতি পেয়েছেন ‘বইওয়ালা দুলাভাই’ নামে।

১৯২১ খ্রিস্টাব্দে (বাংলা সন: ২৫ ভাদ্র, ১৩২৯) নাটোর জেলার বাগাতিপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণকারী পলান সরকার মাত্র পাঁচ মাস বয়সে বাবাকে হারান। পড়াশোনায় হাতেখড়ি হয়েছিল বটে, কিন্তু ষষ্ঠ শ্রেণির পর অর্থাভাবে আর পাঠশালায় যেতে পারেননি। কিন্তু বই পড়া আর পড়ানোর আগ্রহটা তার ভেতরে জেগে ছিল সবসময়ই। গ্রামগঞ্জে বইয়ের বড্ড অভাব। এর-ওর কাছ থেকে ধার করে এনে বই পড়তেন। যখন যে বই পেয়েছেন, সাগ্রহে পড়েছেন।

যৌবনে বিট্রিশ আমলে পলান সরকার ভিড়েছিলেন যাত্রাদলে। গ্রামে গ্রামে ঘুরে অভিনয় করতেন ভাঁড়ের চরিত্রে। বিস্তর লোক হাসাতেন। সেকালে যারা যাত্রাপালা করত, তাদের মধ্যে লিখতে-পড়তে জানা মানুষের বড্ড অভাব ছিল। তখন না ছিল ফটোকপিয়ার, না সাইক্লোস্টাইল মেশিন। তাই যাত্রার পাণ্ডুলিপি কপি করতে হতো হাতে লিখে। পলান সরকার এ কাজ করতেন। পাশাপাশি তাঁকে প্রম্পটও করতে হতো। প্রম্পটর হচ্ছে যাত্রাপালায় যে পর্দার পেছন থেকে অভিনেতা-অভিনেত্রীদের সংলাপ বলে বলে দেয়। সেখানে প্রম্পটরের কাজ করতে করতে তাঁকে বই পড়ার নেশাটা আষ্ঠেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলে।

পলানের নানা ময়েন উদ্দিন সরকার ছিলেন স্থানীয় ছোট জমিদার। যৌবনে পলান সরকার নানার জমিদারির খাজনা আদায় করতেন এবং দেশ বিভাগের পর জমিদারি ব্যবস্থা বিলুপ্ত হলে ১৯৬২ সালে বাউসা ইউনিয়নে কর আদায়কারীর চাকরি পান। নানার কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে ৪০ বিঘা সম্পত্তির মালিক হন।তার দারিদ্র্যভরা শৈশবের পরে উত্তরাধিকারসূত্রে মাতামহের কাছ থেকে পাওয়া এই সম্পত্তি পাওয়ায় তাঁর দারিদ্র্যের তীব্রতা কমে। বিয়ে করে আর দশজন মানুষের মতো সংসারী হন তিনি। ৯ সন্তানকে মানুষের মতো মানুষ করে গড়ে তুলেছেন। নিজে পড়াশুনার সুযোগ পাননি বলে ছেলে মেয়েদের উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করেছেন। বড় ছেলে মোজাফফর হোসেন বাউসা কলেজের প্রভাষক। ছোট ছেলেদের মধ্যে একজন একই কলেজের MLSS, আরেকজন বাউসা উচ্চ বিধ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক, আরেকজন সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক, একজন মোবাইল অপারেটর প্রকৌশলী এবং অপরজন ধানকলের ব্যবসায়ী। ৩ মেয়ের মধ্যে ছোটজন এম.এ পাস করেছেন বাকি দুইজন স্কুলের শিক্ষিকা।

জীবনের শুরুর এ পর্যায়ে চাকুরীর বেতনের টাকায় বই কিনতেন। নিজে পড়তেন, অন্যদেরকেও ধার দিতেন। তারপর উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জমিজমায় আর্থিক স্বচ্ছলতা ফেরার পর নিজের গ্রামে নিজের বসতভিটায় ১৯৬৫ সালে ৫২ শতাংশ জমি দান করেন তিনি। সেখানেই প্রতিষ্ঠিত হয় বাউসা হারুন অর রশীদ দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয়। প্রচণ্ড প্রচারবিমুখ পলান সরকার এই স্কুলে কোন পদ তো দূরে থাক, স্কুলের জমিদাতা হিসেবে তার নামটা প্রকাশ হত, সেটাই চাননি। কিন্তু শেষপর্যন্ত স্থানীয় শিক্ষক, স্কুল পরিচালনা পর্ষদের অনুরোধে তিনি পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৯০ সাল থেকে বাউসা হারুন অর রসিদ শাহ দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রতিবছর যারা মেধাতালিকায় প্রথম দশটি স্থান অর্জন করত তাদের বই উপহার দিতেন পলান সরকার।কিন্তু অন্যান্য শিক্ষার্থীরাও তাঁর কাছে বইয পড়বার আবদার করলে তিনি সিদ্ধান্ত নেন যে তিনি তাদেরও বই দেবেন তবে তা পরা শেষে একটা নির্দিষ্ট সময় পর ফেরত দিতে হবে। এছাড়াও বাউশা গ্রামে তার একটি চালকল ছিল, যেখানে দেনা পরিশোধ করার পর তিনি প্রত্যেককে একটি করে বই উপহার দিতেন। গ্রাম-গঞ্জে বিভিন্ন আত্মীয়স্বজন পাড়াপ্রতিবেশীর বিয়ে, জন্মদিন কিংবা নানা অনুষ্ঠানে তিনি নানা জিনিসের পাশাপাশি বই উপহার দিতেন। এভাবে এক সময় গ্রামের ও দূরদূরান্ত থেকে নানা মানুষ তাঁর কাছে বই চাইতে শুরু করে। এভাবেই শুরু হয় তার বই পড়া আন্দোলনের ভিত।

১৯৯২ সালে ডায়াবেটিস ধরা পড়লো তার, ডাক্তার বলে দিলেন প্রতিদিন হাঁটতে হবে প্রচুর।কমপক্ষে ৩-৪ কিলোমিটার। কিন্তু পলান সরকার এই প্রতিদিনের হাঁটাহাঁটির ব্যাপারটাকেই কাজে লাগালেন অনন্য উপায়ে। তিনি স্কুল ভিত্তিক বই বিতরণ বা মানুষ তার কাছে এসে বই পড়বে-এই ধারণা থেকে বেরিয়ে এসে তিনি হেঁটে হেঁটে মানুষের বাড়ি বাড়ি বই পৌঁছে দেওয়ার কথা চিন্তা করেন। শুরু হয় এক অনন্যসাধারণ পথচলা।

এ ব্যাপারে বলতে গিয়ে তিনি জানান, ‘আমি ভেবে দেখলাম, যারা আমার বাড়ি থেকে বই নিয়ে যায়, আমি নিজেই তো হেঁটে হেঁটে তাদের বাড়িতে গিয়ে বই পৌঁছে দিয়ে আসতে পারি।’ বলেন পলান সরকার। ‘সেই থেকে শুরু। এক বাড়িতে বই দিতে গেলে তার দেখাদেখি আরেক বাড়ির লোকেরাও বই চায়। বই নিয়ে হাঁটা আস্তে আস্তে আমার নেশায় পরিণত হলো।’

পলান সরকার যেতে শুরু করলেন গ্রামে গ্রামে, মানুষের ঘরে ঘরে। তাঁর বই বিলি করার গল্প ছড়িয়ে পড়লে ছাত্রছাত্রী ও গৃহবধূরা বই ধার নিতে তাঁর কাছে ধরনা দিতে শুরু করেন। গ্রামের পথে পথে তিনি ঘুরতে শুরু করেন ভ্রাম্যমাণ এক পাঠাগারের মতো। নিজের গ্রামে তাঁর বাড়িটিই হয়ে ওঠে পাঠাগার।  কোনো বাড়িতে গেলে তাকে খুব আপনজনের মত সমাদর করা হত। তার এই বই পড়ার আন্দোলন উত্তর পশ্চিমাঞ্চলের সেই সুবিধাবঞ্চিত গ্রামগুলোতে এক সুদূরপ্রসারী ভূমিকা ফেলে। পলান সরকারের হাত ধরে ৫৫ বছর বয়সী আবদুর রহিম হয়ে উঠেছেন বইয়ের নিয়মিত পাঠক। বাঘা উপজেলার দিঘা বাজারে রহিমের মুদির দোকান রয়েছে। এখন তিনি শুধু নিজেই বই পড়েন না, প্রতি বিকেলে তাঁর দোকানে বসে বই পড়ার আসর। আবদুর রহিম বলেন, পলান সরকার তাঁর ভেতরে বইয়ের আলো জ্বেলে দিয়েছেন।  পলান সরকারের এই উদ্যোগ এক মাদকাসক্তকেও দিয়েছিল নতুন জীবন।

একেবারেই প্রচার বিমুখ এই মহান আলোর দিশারীকে বাঘা উপজেলার আশেপাশের ২০ গ্রামের মানুষই কেবল চিনতো। এরপর ২০০৬ সালের ২৯ ডিসেম্বর বিটিভির জনপ্রিয় ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘ইত্যাদি’ সর্বপ্রথম তুলে আনে এই বইয়ের ফেরিওয়ালাকে। এরপর ২০০৭ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রথম আলো তাঁকে নিয়ে প্রকাশ করে একটি বিশেষ প্রতিবেদন।তার নিঃস্বার্থ নির্লোভ নীরব সংগ্রামের কথা ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র।

তার কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০৯ সালে স্থানীয় জেলা পরিষদ তাঁর বাড়ির আঙিনায় একটি পাঠাগার প্রতিষ্ঠা করে। রাষ্ট্রের বিশেষ সম্মান একুশে পদকে তাঁকে ভূষিত করা হয়। তাঁর এই আন্দোলনের গভীর প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে তাঁর নিজের ও আশপাশের গ্রামগুলোর সীমানার বাইরে। অনেকেই এখন এগিয়ে এসেছেন গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠা এবং গ্রামে গ্রামে বই বিতরণের আন্দোলনে।

৯৬ বছর বয়সেও পলান সরকার প্রতিদিন দু-তিন গ্রামে হেঁটে পৌঁছে দেন জ্ঞানের আলোকশিখা। তিনি আমাদের অনুপ্রেরণা। গত ৯ই সেপ্টেম্বর ছিল তার জন্মদিন। মানুষের মাঝে জ্ঞানের প্রদীপশিক্ষা প্রজ্বলনে তার এই নিরলস ভূমিকা আমরা স্মরণ করবো সব সময়। আরও অনেক অনেক দিন বেঁচে থাকুন তিনি, আর তার এই উদাহরণ ছড়িয়ে পড়ুক সারা বাংলাদেশে, বই পড়ার নেশা ছড়িয়ে দিতে পথে পথে বেরিয়ে আসুক আরও অসংখ্য পলান সরকার।

তার প্রতি অতল শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
Design by: JIT Solution