1. jitsolution24@gmail.com : Rajbaribd desk : Rajbaribd desk
রবিবার, ২৭ নভেম্বর ২০২২, ০৪:৩১ অপরাহ্ন
Title :
অতিরিক্ত দামে তেল বিক্রি করছেন রাজবাড়ীর সকল ফিলিং ষ্টেশন গোয়ালন্দে ৪ কেজি গাজাসহ যুবক গ্রেফতার পাংশায় কবি সাহিত্যিকদের মিলন মেলায় গুনীজন সংবর্ধনা প্রধামমন্ত্রীর জনসভা থেকে চুরি হওয়া ফোনসেট গোয়ালন্দে উদ্ধার, গ্রেপ্তার ২ পাংশায় জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্যদের সংবর্ধনা পাংশায় জাল সনদে চাকুরীর অভিযোগ ‘বর্তমান সরকার কৃষি বান্ধব’ গোয়ালন্দে কৃষকলীগের সম্মেলনে নূরে আলম সিদ্দিকী হক ‘বিএনপি ভ্যান চালকদের নিকট থেকে চাল কেড়ে নিয়েছে’ -জিল্লুল হাকিম এমপি গোয়ালন্দে সহস্রাধিক সুবিধাবঞ্চিত শিশু নিয়ে দিনব্যাপী ব্যাতিক্রমী আয়োজন গোয়ালন্দে অগ্নিকান্ডে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে সহায়তা প্রদান

২৫ বছর বয়সেই সমগ্র বাংলাদেশ ভ্রমণের গল্প!

Reporter Name
  • Update Time : বুধবার, ১৫ নভেম্বর, ২০১৭
  • ১০৫০ Time View

জীবনটা তখন সহজ ছিল না। বিশ্বসংসার জুড়ে শুধু ব্যস্ততা। কারো যেন সময় নেই। কোথাও কেউ নেই। কী দ্রুতগতিতে সময়গুলো চলে যাচ্ছে। অথচ, মাঝেমধ্যেই তো মানিকবাবুর উপন্যাসের উক্তির মতো মনে হয়, আহারে জীবন এতো ছোট ক্যানে! কিছুই করা হলো না।

নিজেকে কোনো কোনো দিন মুক্ত করে দিতে ইচ্ছে হয়। মনে হয়, এই যাপিত জীবন, সন্ধ্যার নিস্তব্ধতার মতো নিঃসঙ্গ এই জীবন, এই হাজার মানুষের অরণ্যের ভীড়ে একা থাকার জীবনটাকে জলে ভাসা পদ্মের মতো যদি ভাসিয়ে দেয়া যেতো! সব পিছুটান, জমানো কিছু অভিমান, ক্লান্ত বোবা প্রাণ- সব কিছু যেন কেমন জট লেগে যায়। আর কত!

ভেটেরিনারি ও এনিম্যাল সাইন্স সাবজেক্ট। বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবন হয়ে যাচ্ছিল গতানুগতিক গতিহীনতায় ভরা কোনো স্তব্ধ ময়দান। মনের ইঞ্জিনে যেন জঙ ধরে যাচ্ছিল। কঠিন সাবজেক্ট। ক্লাস, এটেন্ডেন্স এবং আরো কিছু বিবিধ দায়-দায়িত্বের দায় মাথায়। একদিন তার মনে হলো, “সব তো সবার জন্যেই করলাম, কী করলাম নিজের জন্যে..।” তিনি বেরিয়ে পড়লেন। সব ছেড়েছুড়ে একাই ফেব্রুয়ারির ঝিমিয়ে আসা শীতের একদিনে তিনি বেরিয়ে পড়লেন নিজের খোঁজে।

অবশেষে, সাদিদ আল আমাজ নামের মানুষটা নিজেকে খুঁজে পেলেন। তিনি নিজেকে খুঁজে পেলেন বাংলাদেশ জুড়ে। নিজেকে তিনি খুঁজে বেড়ালেন ৬৪ জেলা জুড়ে!

বাংলাদেশের সেই বিরল কয়েকজনদের একজন তিনি যিনি ৬৪ জেলা ঘুরার গৌরবময় কীর্তি গড়েছেন। সম্ভবত, একমাত্র মানুষ যিনি এক বছরেই দেশের সব কয়টি জেলা ঘুরেছেন। কারো কারো কাছে এখন তিনি “ব্যাকপ্যাকার্স উইকিপিডিয়া”। তরুণদের অনেকেই তার কাছে পরামর্শ খোঁজেন কিভাবে কম খরচে ঘোরা যায়, কোথায় থাকা যায়, কিভাবে যাওয়া যায়।

মানুষটার বয়স খুব বেশি না। সদ্য চার বছরের পাঠ চুকিয়ে এক বছরের ইন্টার্ন করছিলেন। ইন্টার্নের ফাঁকেফাঁকে ঘুরে ফেললেন প্রিয় স্বদেশ। অথচ, এমন সময় গিয়েছিলো, খুব ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও বন্ধুদের সাথে কোথাও যেতে পারেননি। হয়তো, তার সময় থাকলে বন্ধুদের সাথে সময় মিলতো না। আবার, বন্ধুদের সময় হলে তার হয়তো টাকার মিল হতো না। কত রকমের টানাপোড়েনের গল্প। এসব গল্পের মধ্যেও ইচ্ছাটা মরে যায়নি। বরং, সময়ে সময়ে আরো তীব্র হয়েছে।

কিন্তু সারাদেশ ঘুরে ফেলবেন এটা শুরুতে নিজেও ভাবতে পারেননি। ইন্টার্ণশীপ যখন যেখানে পড়তো সেখানে গিয়ে আশেপাশের জেলা ঘুরতেন। রোজার ঈদে উপলব্ধি করলেন ২৮ টা জেলা ঘুরা হয়েছে। তখনই চিন্তাটা আসলো। তাহলে ৬৪ জেলা কেন নয়?

অনেকেই চমকে যায় যখন শুনে সাদিদ ৬৪ জেলা ঘুরে শেষ করেছেন, তাও এতো অল্প সময়ে। তাদের কারো কারো মনে প্রশ্ন উঠে, এত ঘুরার সময় সে কিভাবে পেলো, টাকাই বা কে দিল! সে কি টাকার কুমির নাকি কোনো আলাদিনের চেরাগ পেয়েছে!

সাদিদ এই প্রশ্নটার যে ব্যাখ্যা দিয়েছেন সেটা শুনে একটা বিষয় মনে হয়েছে, ইচ্ছেটাই আসল। বাদ বাকি সব সময় এনে দেয়। সাদিদ জানালেন, ৬৪ জেলা ট্যুরের মোট খরচ হয়েছে ৭০ হাজারের মতো। কিছু টাকা জমিয়ে রেখেছিলেন। ২০ হাজারের মতো। সেই টাকায় প্রথম ২৪ জেলা ঘুরেছিলেন তিনি। এরপর তার মাথায় ভূত উঠলো ৬৪ জেলার সবগুলো ঘুরতে হবে। তারপর?

“….তারপর খেয়ে না খেয়ে টাকা জোগাড় শুরু হলো। যেহেতু হলে থাকতাম তাই সব দিক দিয়ে খরচ কাটছাঁট শুরু হলো, যেখানে প্রতি সপ্তাহের এক-দুইবার বাইরে খেতে যেতাম সেটা বন্ধ, নেট স্পিড অর্ধেক, বিল অর্ধেক… চা,নাস্তা প্রায় বন্ধ… এভাবে প্রতি মাসে প্রায় ২ হাজার বাঁচাতাম…! ইন্টার্নিশিপের কিছু বেতন ছিলো, লাস্ট দুই ঈদের কোন কাপড়চোপড় কিনিনি… ধরতে গেলে গত দেড় বছরে আমি কোন নতুন কাপড়, জুতা, স্যান্ডেল কিছুই কিনিনি। এছাড়াও ছিল খালা, ফুফু, মামা, চাচাদের দেওয়া টাকা পয়সা, ঈদ সালামী…সব টাকা গুনে গুনে পকেটে…! এই টাকার একটা পয়সাও খরচ করিনি…

কষ্টের টাকায় শ্রেষ্ঠ ট্যুর দেয়ার ব্যাপারটাকে সাদিদ আল আমাজ নিয়ে গিয়েছেন শিল্পের পর্যায়ে। তার কথা হচ্ছে, ঘুরতে যাওয়ার জন্য আসলে সবচেয়ে বেশি জরুরি ঘুরতে যাওয়ার মানসিকতা। কম খরচে যারা ঘুরতে চান, তাদের জন্য বলতে গিয়ে নিজের অভিজ্ঞতাই বললেন তিনি।

আমি সবকিছুকেই চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিতাম। আমি কম টাকায় বাসে, ট্রাক, ট্রেনের ছাদে গিয়েছি। এটাকে আসলে নতুন অভিজ্ঞতা হিসেবে নিতাম, চলার পথে সব কিছু এনজয় করতাম। কোন কিছু নিয়ে আমার কোন অভিযোগ ছিল না। সবসময় নিজেকে ছাড়িয়ে যাবার চেষ্টা ছিল। তাই কখনোই আমার কষ্ট হতো না, আমি সবসময় এক্সপ্লোর কর‍তে চাইতাম।

…ঘুরতে যাবার জন্য ঘুরতে যেতে হবে, খাবার জন্য, দামি হোটেলে থাকার জন্য নয়।”

এই চলার পথে কত ঘটনা ঘটেছে হিসেব নেই। একটা গল্প শোনালেন। রাত জাগা কিংবা অনিশ্চয়তার গল্প।

জয়পুরহাটের পাঁঁচবিবি থেকে একটা রাজবাড়ি দেখে, জয়পুরহাট শহরে ফিরতে ফিরতে রাত ৮ টা বেজে গেল। সবাই বলেছিল ওখানে রাতে না থাকতে, থাকলে যাতে বগুড়া এসে থাকি। কারণ ওটা বর্ডার এলাকা, তেমন নাকি সুবিধার না। রাত ৮ টায় বগুড়ার শেষ বাস ধরলাম।শহরে এসে পৌঁছালাম ১০ টার দিকে। রাতে বগুড়ার বিখ্যাত চুন্নুর চাপ খেলাম। পরেরদিন টাঙাইল যাবার প্ল্যান ছিল। আবার আমার টাকাও বাঁচাতে হবে। তাই তখনই ডিশিসন নিলাম যে বগুড়াতে হোটেলে থাকবো না। থাকলে বেশি টাকা খরচ হবে। বরং টাঙাইলের লোকাল ধরি, খরচ কম হবে। আবার রাতটাও কেটে যাবে। ১৫০ টাকা ভাড়ায় দামাদামি করে বাসে উঠতে উঠতে ১২ টা বেজে গেল। বাসে উঠে দেখি, সবাই লুঙি পরা, আমিই খালি একা হাফপ্যান্ট পরা মানুষ! বাসের লাস্ট সিটে বসে হালকা ঘুম দিলাম, খুব ভালো ঘুম হলো না। হেলপার রাত ৩ টায় ডেকে তুললো, ভাই এসে গেছি নামেন। আমি উঠে গেলাম। দরজার কাছে যাবার পরে সে বলে, ভাই কিছু মনে কইরেন না, শহর থেকে ১৫ কিলো দূরে চলে আসছি। আপনাকে ডাকতে মনে ছিল না। অতঃপর তাকে বললাম একটা তেলের পাম্প দেখে নামিয়ে দিতে। তখন রাত তিনটা বাজে! দুই দিন ধরে ঘুম হয় না! আর নেমে গেলাম মাঝ রাস্তায়! ভাগ্য ভালো পাশে একটা টং ছিলো। চা খেয়ে বসে থাকলাম। ভোর ৫ টার দিকে মামা বললো, এখন চলে যান পরে বাস পাবেন না। ভাড়া বেশি নিবে। তার কথা শুনে রাস্তায় দাঁড়ালাম, কিছুক্ষন দাড়ানোর পর একটা রিকশা পাওয়া গেলো! ভোর ৫ টায়। রিকশাওয়ালাকে জিজ্ঞাস করলাম, ভাই এত সকালে কি করেন? সে বললো,সে নাকি রাত ৮ টায় বাড্ডা থেকে রিকশা চালিয়ে টাঙাইল এসেছে!

কত অদ্ভুত এই জীবনধারা!

৬৪ জেলা ঘুরার পর এখন কেমন লাগে তার?

“বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি, তাই আমি পৃথিবীর রূপ খুঁজিতে যাই না আর- জীবনানন্দের এই কবিতার সত্যতা আমি খুজে পেয়েছি।”

সাথে যোগ করলেন, বাংলাদেশে এতো অসাধারণ জায়গা আছে যার সম্পর্কে খুব কম লোকই জানে। ঐতিহাসিক অনেক স্থাপনা, পুরানো রাজবাড়ি পড়ে আছে অবহেলায় অনেক জায়গায়। দেখার কেউ নেই। সংরক্ষণের অভাব পর্যটন বিকাশের এক বিরাট অন্তরায় বলে তার ধারণা। তথ্য সংকটও পর্যটন উন্নতির পথে বাধা বলে তিনি উল্লেখ করলেন। ইন্টারনেটে গোছানো তথ্য নেই। কীভাবে যেতে হবে, কোথায় থাকতে হবে এসব অনিশ্চয়তা অনেক সম্ভাবনাময় জেলাকে পর্যটনখাতে জনপ্রিয় হওয়া থেকে বঞ্চিত করে রেখেছে।

তবে একটা ব্যাপার উপলব্ধি করলেন ছোট থেকেই এই ঢাকা শহরে বেড়ে ওঠা সাদিদ। ঢাকার বাইরের জগতটা অনেক আলাদা। মানুষগুলো কি ভীষণ সহজ সরল। আর কি রুপ মহিমা একেকটা জেলার। দিনাজপুর, নীলফামারির গ্রামগুলো এখনো চোখে লেগে আছে। এতো সবুজ কোথাও নেই। নীলফামারি থেকে ১০০ কি.মি অটোতে করে লালমনিরহাটের পথে যেতে যেতে এই প্রকৃতির স্নিগ্ধতা তাকে মাতাল করে দিচ্ছিল। পড়ন্ত বিকেলের গ্রামের মধ্যে মোহনিয়া বাতাস কেটে কেটে চলাকে মনে হয়েছিলো এ যেনো পাখির জীবন!

এখন আর জীবন আগের মতো নেই। আজকাল দীর্ঘশ্বাস আগের মতো দীর্ঘ হয় না। নিজেকে খুঁজে পাওয়ার যে ভীষণ আনন্দ! এখন দেখার চোখ পালটে গিয়েছে। আজকাল এই বেঁচে থাকাটাকে বড় প্রাপ্তি মনে হয়।

“৬৪ জেলা ঘুরার আগে আমি যেই মানুষটা ছিলাম, ৬৪ জেলা ঘুরার পরে আমি আর সেই মানুষটা নেই। একদম অন্য মানুষে পরিণত হয়েছি। আমার চিন্তাধারায় অনেক বড় পরিবর্তন এসেছে। আমি বুঝতে শিখেছি এত বিশাল পৃথিবীতে আমি কত ক্ষুদ্র। এটা আমাকে আরো বিনয়ী করেছে।”

আজকাল তার মনে হয়, নিজের উপর দয়া করা ছেড়ে, নিজেকে ভালোবাসতে হবে। কারণ নিজেকে নিজেই ভালো রাখতে হয়, কেউ কাউকে ভালো রাখতে পারে না। আর এত সুন্দর পৃথিবীতে ডিপ্রেশন মানেই সময় নষ্ট। আমারও তাই মনে হয়! ভালবাসার আসলে অভাব নেই। যদি চেনা জগতে তাকে খুঁজে না পাওয়া যায়, তবে ভালবাসা তৈরি করে নিতে হয় অন্য কোনো অজানায়।

সাদিদ আল আমাজ ৬৪ জেলার হাজারো অচেনা মানুষের মানুষের ভালবাসায় জড়িয়ে আছেন। এই ভালবাসার কোনো ব্যাখ্যা নেই।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
Design by: JIT Solution