অক্সিজেন সিলিন্ডার দিয়ে রোগীর ক্ষতি করছেন না তো?

0
204
ডাঃ রাজীব দে সরকার
চিকিৎসক (৩৩ বিসিএস), করোনা ইউনিট 
শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।
যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, ৩৩ বিসিএস স্বাস্থ্য ক্যাডার অ্যাসোসিয়েশন (কেন্দ্রীয় কমিটি)
প্রচার ও জনসংযোগ সম্পাদক, বিএমএ, রাজবাড়ী জেলা।
আহবায়ক, সুহৃদ সমাবেশ, গোয়ালন্দ।
ফেসবুক পেইজঃ Rajib Dey Sarker.
প্রকাশক, রাজবাড়ীবিডি.কম

অক্সিজেন নিয়ে করোনা মৌসুমে একটি অবৈজ্ঞানিক বিষয় আমাকে আগেও ভাবিয়েছে। সেটা হলো স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর বাড়ি বাড়ি অক্সিজেন পৌছে দেওয়া।
“Desperate time calls for desperate measures” বলেই হয়তো বা এই খটকাটা এতোদিন চোখের আড়াল করে রেখেছিলাম।
করোনা আক্রান্ত শ্বাসকষ্টের রোগীগুলোকে বাড়ি বাড়ি অক্সিজেন পৌছে দেওয়ার কাজটি আসলে আদতে অর্থহীন এবং কেউ দেখাতে পারবেন না, মেডিকেল সাইন্স এর কোন বইয়ে বাসায় রোগী রেখে অক্সিজেন দেবার কথা বলা হয়েছে। প্যালিয়েটিভ কেয়ারে থাকা কিছু রোগীর সিম্পটম রিলিফের জন্য অক্সিজেন প্রয়োজন হলেও সেখানে মেডিকেল পার্সোনেল (প্যারামেডিক, নার্স, মেডিকেল অ্যাসিস্টেন্ট, ট্রেইন্ড কেয়ার গিভার) এর গাইডেন্সে অক্সিজেন প্রদান করা হয়।
মেডিকেল অক্সিজেনকে কোন অবস্থাতেই হোম অ্যাপ্লায়েন্স বানানোর সুযোগ নেই।
কারনঃ
১। যে রোগীর আসলেই অক্সিজেন প্রয়োজন হবে, তার চিকিৎসা আপনি বাসায় রেখে করছেন, মানে বোকামি করছেন। আপনি মনে করছেন, এতে মুমূর্ষু রোগীটার চিকিৎসা হচ্ছে, আসলে আপনি হাসপাতালে আসার কালক্ষেপন করছেন।
২। সিলিন্ডার এর ধারণ ক্ষমতা সীমিত  এবং শেষ হয়ে গেলে বার বার বদলানো এবং সংশ্লিষ্ট টেকনিক্যাল নলেজ সবার থাকবে না। ফলে বড় ধরণের দূর্ঘটনা ঘটতে পারে।
৩। অক্সিজেন সিলিন্ডার থেকে দূর্ঘটনা ঘটলে বা আগুন ধরে গেলে, সেটা নিয়ন্ত্রণে আনার মতো অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা বাংলাদেশের বাসা বাড়িতে পাওয়া দুষ্কর। সুতরাং বৃহত্তর দূর্ঘটনা ঘটলে সেটা রোগী ও তার পরিবারের অপূরণীয় ক্ষতি করবে।
৪। অক্সিজেন সিলিন্ডার এর ব্যবস্থাপনা (মেইন্সটেনেন্স অর্থে) সংক্রান্ত কোন জ্ঞান সাধারণ জনগণের নেই। বিশ্বাস করুন, আমি একজন চিকিৎসক, আমারো ছিলো না। নেহায়েতই ল্যাপারোস্কপিক সার্জারীর টুলস নাড়াচাড়া করার সুযোগ পাই বলে কার্বন-ডাই-অক্সাইড এর সিলিন্ডার সেট-আপ করতে পারি। কারন সেটা ল্যাপারোস্কপিক ইনসাফ্লেটর ডিভাইস এ কানেক্ট করতে হয়। ল্যাপারোস্কপি ভালোবাসি বলে শুধু নিজের আগ্রহেই কাজটা শিখেছি।
৫। ভয়ংকর বিষয়টি হলো, মিনিটে ৫-১০ লিটার বেগে অক্সিজেন দিয়ে রোগীর শ্বাসযন্ত্রের করোনা ভাইরাস গুলোকে আপনি আপনার বাসার পরিবেশে ছড়িয়ে দিচ্ছেন। ফলে বাড়ির অন্য সবাইকে আক্রান্ত করবার উর্বর পরিবেশ তৈরী করছেন। আপনার অজান্তে আপনি আপনার বাসাটাকে “ডেডিকেটেড করোনা ওয়ার্ড” বানিয়ে ফেলছেন।
এবার,
আমার অভিজ্ঞতা বলিঃ
গত রোস্টারে ডিউটি করার সময়ে যে কয়টি ডেথ সার্টিফিকেট আমি নিজের হাতে লিখেছি, এরা প্রত্যেকেই প্রথমে বাসায় রেখে রোগীকে অক্সিজেন দিয়েছেন। পরবর্তীতে অবস্থার উল্লেখযোগ্য অবনতি হলে যখন আমাদের কাছে এনেছেন, আমাদের করণীয় খুব কমই ছিলো।
অক্সিজেন এর পাশাপাশি হাসপাতালে রোগীকে আমরা লক্ষণ ও রোগের গভীরতা বিবেচনায় আরো কিছু আই-ভি ঔষধ দেই। এছাড়াও রোগীকে প্রোনিং ও ব্রেথিং এক্সারসাইজ এর পরামর্শ দেওয়া হয়। এই বিষয়গুলো সেবিকা ও ওয়ার্ড এমপ্লয়িগণ মনিটর করতে পারেন। প্রয়োজনে দেখিয়ে/শিখিয়ে দেন। সন্দেহাতীতভাবেই বাসায় অক্সিজেন পেলেও রোগী এই সেবা গুলো পান না।
এই অভিজ্ঞতা থেকে আমি কিছু সাজেশন আপনাকে দিতে পারি।
১। mild case এর রোগীদের অক্সিজেন নেবার কথা কোন গাইডলাইনেই বলা নাই। সুতরাং রোগীর করোনা রিপোর্ট “পজিটিভ” এসেছে মানেই যে আপনাকে একটা অক্সিজেন সিলিন্ডার কিনে ফেলতে হবে, এই ধারণাটা ভুল। এটা করবেন না।
২। আপনার রোগীর সত্যি সত্যি শ্বাসকষ্ট হলে বা অক্সিজেন স্যাচুরেশন ফল করলে দ্রুত তাকে হাসপাতালে আনুন। হাসপাতালে আনার পথে অ্যাম্বুলেন্সে থাকা অক্সিজেন এর সাহায্য নিন। প্রয়োজনে সেখানে সাধারণ অক্সিজেন মাস্ক এর পরিবর্তে NRB Mask লাগাতে পারেন।
৩। করোনা আক্রান্ত রোগী করোনা নেগেটিভ হবার পরেও বেশ কিছুদিন বুকে ব্যাথা বা শ্বাস কষ্টের মতো অবস্থা থাকতে পারে। এক্ষেত্রে আপনাকে নিয়মিত চিকিৎসক এর ফলোয়াপে থাকতে হবে। অক্সিজেন প্রয়োজন হচ্ছে এমন রোগীকে চিকিৎসকরা কখনোই ছুটি দিয়ে দেন না। সুতরাং বাসায় অক্সিজেন এর ব্যবহার দরকার হবে না।
৪। সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখি অনেক সংগঠন বাসায় অক্সিজেন পৌছে দিচ্ছেন। আপনাদের মহৎ উদ্দেশ্যকে কুর্নিশ করে জানাতে চাই, মাইল্ড কেস এর রোগীদের বাসায় অক্সিজেন পৌছে দিয়ে আপনার একটি কৃত্রিম অক্সিজেন সংকট তৈরী করছেন, সিলিন্ডারজাত অক্সিজেন এর দাম বাড়িয়ে দিচ্ছেন এবং একটি মহলকে করোনা ব্যবসায় ব্রতী করছেন। আপনাদের জন্য আমার অনুরোধঃ
(ক) আপনার এলাকায় যতোগুলো অ্যাম্বুলেন্স আছে, সেখানে নিরবিচ্ছিন্ন অক্সিজেন এর যোগান নিশ্চিত করুন সবার আগে। (বাসায় বাসায় মেডিকেল অক্সিজেন পৌছে না দিয়ে)। অনেক সময়ই দেখা যায় রোগীরা হাসপাতালে গিয়ে সীট পাচ্ছেন না। ফলে অন্য একটি হাসপাতালে যাচ্ছেন। এই বর্ধিত ট্রান্সপোর্টের সময়ে আপনার দেওয়া অক্সিজেনটা এখানে আসলেই কাজে লাগবে।
(খ) আপনার এলাকার সরকারী হাসপাতালগুলো যেখানে সেন্ট্রাল অক্সিজেন সাপ্লাই নাই, সেখানে অক্সিজেন এর মজুদ বাড়াতে সাহায্য করুন। কারন মজুদ ফুরিয়ে গেলে  শুধু চিকিৎসক-সেবিকারা বিপদে পড়বেন না। হাসপাতালের জরুরী বিভাগ, ইনডোর, আইসোলেশন জোন সর্বত্র আপনাদের সিলিন্ডার পৌছে দিন।
(গ) বাড়ি বাড়ি কাঁধে করে অক্সিজেন দেওয়া বন্ধ করুন। কারন আবেগী মনস্তত্ত্বে আপনি ভাবছেন, আপনি সিলিন্ডার টা দিয়ে কারো জীবন বাঁচাচ্ছেন। আদতে আপনি মোটেও সেটা করছেন না। আপনি হয় এমন কাউকে অক্সিজেন পৌছে দিচ্ছেন, যার আসলে অক্সিজেন এর প্রয়োজন নাই, অথবা সত্যি সত্যি অক্সিজেন সহ অন্যান্য জরুরী চিকিৎসা লাগবে এমন কারো চিকিৎসা আপনি সিলিন্ডার দিয়ে বিলম্ব করাচ্ছেন।
(ঘ) অক্সিজেন দিয়ে সংগঠনের প্রচারই যদি আপনার উদ্দেশ্য হয়, তাহলে উপরের ১ / ২ / ৩ / ৪ এবং ক / খ / গ – আপনার জন্য না।
অক্সিজেন এর রিসোর্স আমাদের অনেক অনেক বেশী না। খবরে দেখেছি সরকারী অনেক স্বনামধন্য হাসপাতালে অক্সিজেন এর মজুদ হঠাৎ ফুরিয়ে গেছে। সেন্ট্রাল লাইনে প্রেশার না থাকলে অনেক অক্সিজেন বেজড ডিভাইস কিন্তু চালানো যায় না। এই সীমিত সম্পদ দিয়েই কিন্তু লড়াই টা লড়ে যেতে হবে আরো বেশ কিছু দিন।
এখন আপনাদেরকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে, অক্সিজেন এর ব্যবহারে, বিতরণে, ব্যবসায়, ব্র‍্যান্ডিং-এ আপনি সচেতন হবেন কী না।
অক্সিজেন নিজে জ্বলে না,
অপরকে জ্বলতে সাহায্য করে।
আপনি নিজেও বাঁচুন,
এবং অপরকে বাঁচতে সাহায্য করুন,
কিন্তু সঠিক উপায়ে!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here