বরিশালের মেয়র বনাম ইউএনওঃ পচনশীল একটি সিস্টেমের উদাহরণ নয় তো?

0
297

ডাঃ রাজীব দে সরকার
চিকিৎসক (৩৩ বিসিএস)
শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।
যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, ৩৩ বিসিএস স্বাস্থ্য ক্যাডার অ্যাসোসিয়েশন (কেন্দ্রীয় কমিটি)
প্রচার ও জনসংযোগ সম্পাদক, বিএমএ, রাজবাড়ী জেলা।

বরিশালের মেয়র মহোদয় এবং ইউএনও স্যারের এই দ্বন্দ্বের খবর খুব ভালো কিছুর ইঙ্গিত দেয় না। বরং সবার অলক্ষ্যে আমাদের রাজনীতি বা সিস্টেমের একটি পচনের দিকে আমাদের চোখ নিয়ে যায়।

যেহেতু বিষয়টি মামলা/আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে, তাই তদন্তাধীন এ বিষয়ে আমার কোন মন্তব্য দেবো না।

সমকালীন প্রেক্ষাপটে আমার কিছু অবজারভেশন আর একটা গল্প বলার চেষ্টা করবো। আমরা যারা একসময় ছাত্ররাজনীতি করতাম, জীবনের পরিক্রমায় আমরা এখন প্রজাতন্ত্রের চাকরী করি এবং রাষ্ট্র তার বিদ্যমান কর্মপন্থা বা কর্মকৌশল আমাদের মাধ্যমেই পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন ও ফলভোগ করে। মেডিকেল কলেজে থাকতে আমরা যারা ছাত্রলীগ করতাম, তাদের একটি অংশ আমরা চিকিৎসক হবার পাশাপাশি সরকারী চাকুরীতে প্রবেশ করে জনগণের সেবক হয়েছি।

অর্থাৎ কী না, অধিকার আদায়ের জন্য স্লোগান দিতে দিতে আমরা যে টেবিল গুলো ঘিরে দাঁড়াতাম, প্রয়োজনে অবরোধ করতাম, সময়ের পরিক্রমায় আমরা সেই চেয়ারগুলোতে বা চেয়ারগুলোর পাশের/কাছের চেয়ারগুলোতে চলে এসেছি। একথা বলাও অত্যুক্তি না যে, দলীয় সরকার আমাদের মাধ্যমেই তাদের নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করেন। অর্থাৎ রাজপথের সৈনিকেরা আজ প্রজাতন্ত্রের সৈনিক।

এর বিপরীত চিত্রও আছে। ক্যাম্পাসে স্বাধীনতা বিরোধী সংগঠনের পতাকাতলে যারা ছিলেন, তাদেরও চাকরী হয়েছে। সেসব আমার দেখার বিষয় না। NSI Verification, Police Verification এর পরেও যদি তারা প্রজাতন্ত্রের নীতিনির্ধারনী পর্যায়ে চলে আসেন, তাহলে “জননেত্রী তোমার কাছে বিচার দিলাম” বলে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকা ছাড়া আমাদের আর কিছু করণীয় নাই। যাই হোক, এই আলাপ থাক।

রাজনীতির পরিক্রমাও থেমে থাকে না। সমসাময়িক ছাত্ররাজনীতির অনেকেই এখন প্রতিষ্ঠিত/নির্বাসিত/বিতাড়িত রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী বা জনপ্রতিনিধি। বৃহত্তর অর্থে আমাদের পতাকাটা কিন্তু একই। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিত এবং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শের প্রতি অবিচল ভালোবাসাই আমাদের মূল ব্যানার। অথচ এই একই পরিবারের সদস্য হয়েও আমরা আজ ক্ষমতা বা দখলদারিত্ব প্রকাশের ভয়ংকর ইগোতে আক্রান্ত।

আমি বাংলাদেশ ছাত্রলীগের নিবেদিত প্রাণ কর্মী ছিলাম। পেশাগত জীবনে এসেও স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের আজীবন সদস্য হয়েই জীবন শুরু করেছি। আমি বিশ্বাস করি, আমার হাতেই আমার হাসপাতাল (আমার প্রতিষ্ঠান) সর্বাধিক নিরাপদ।

তো একদা আমি আমারই কোন এক হাসপাতালে দায়িত্বরত ছিলাম। রাত তখন প্রায় সাড়ে ১১ টা। (গল্পটা কিন্তু শুরু করেছি)

জরুরী বিভাগ থেকে ফোন এলো, “স্যার আপনার সাথে একজন দেখা করতে আসছে, একটু আসেন”

আমি ভেবেছি জরুরী কোন রোগী। কারন, দায়িত্বরত চিকিৎসক হিসেবে ওয়ার্ডের সকল রোগীর ফলোয়াপ আমার জানা এবং রাতের বেলার রাউন্ড আমি নিজেই দিয়েছি। সুতরাং জরুরী বিভাগে কল মানেই নতুন রোগী।

আমি তখন হাসপাতাল কোয়ার্টারেই থাকি এবং ১ মিনিটের মধ্যেই জরুরী বিভাগে চলে গেলাম। ওখানে গিয়ে শুনলাম, যিনি আমার সাথে দেখা করতে এসেছেন, তিনি আমাকে ওয়ার্ডে ডেকেছেন। আমিও ওয়ার্ডে গেলাম।

ওয়ার্ডে গিয়ে দেখলাম, খুব ইয়াং একটা ছেলে সিস্টার এর চেয়ারে বসে আছে। শুধু বসেই নেই, পায়ের উপর পা তুলে বসে আছে। আর তার পাশে আমার ওয়ার্ডের সিস্টার চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে আছেন।

— “ডাক্তার সাব,… আপনার ডিউটি? আপনে কোন মেডিকেল তে পাশ করছেন?”

— “জ্বী, স্লামালিকুম, আমার ডিউটি। আপনিই কি আমাকে ডেকেছেন?”

— “হুম, ডেকেছি। অমুক বেডে তো আমার রোগী আছে। একটু খেয়াল রাইখেন। আমার রোগী, বোঝেন না ব্যাপারটা”

— “আমি একটু আগেই রাউন্ড দিয়েছি, সব রোগী ভালো আছেন। আপনার রোগী আগের থেকে বেশ ভালো আছেন। আপনার কি কিছু জানার আছে আপনার রোগীর ব্যাপারে?”

— “ডাক্তার সাব, এই হাসপাতালের সব রোগীর দায়িত্বই আমার। বোঝেন নাই, ব্যাপারটা। আমি অমুক ইউনিয়ন ছাত্রলীগের অমুক সম্পাদক”

— “ও, তোমার নাম কি ভাই? (লক্ষ্য করুন, “তুমি” তে নেমে এসেছি) বাড়ি কই তোমার? তুমি কি আমার ব্যাপারে কিছু জানো?

— “না, আপনে ক্যাডা? আমার রোগীর যেন কোন কষ্ট না হয়, দেইখেন। কোন সমস্যা হইলে বোঝেনই তো!”

— “শোনো ভাই, তুমি যখন প্যান্ট পড়া শিখো নাই, আমি তখন থেকে ছাত্রলীগ করি। তুমি যে ছাত্রলীগ করো, আমিও সেই ছাত্রলীগ কইরাই এতো দূর আসছি। কার আন্ডারে রাজনীতি করো জানি না, তবে তুমি যে ছাত্রলীগ এর এক বড় ভাই রে ডাইক্যা আনলা, এইটা কতো বড় বেয়াদবি তুমি জানো? কয়দিন হয়, রাজনীতি শিখছো? রাজনীতি তোমার শাউয়া দিয়া ঢুকায়ে দিমু। তোমার উপজেলা ছাত্রলীগের প্রেসিডেন্টকে ফোন দিবো এখন? ওরে জানাবো, তুমি এইখানে আইসা তাফালিং করতেসো?”

ছেলেটা চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়েছে। কিছু বলার চেষ্টা করছে, কিন্তু কথা সাজিয়ে উঠতে পারছে না। মেডিকেল কলেজে প্রফের ভাইবার সময় কোন প্রশ্নের উত্তর একদমই না পারলে আমাদের যেমন অবস্থা হয়, অনেকটা তেমন।

আমার সিস্টার অন্যদিকে তাকিয়ে হাসছেন।

আমি নিচে নেমে গেলাম। ছেলেটাও আমার পিছে পিছে নামলো। কারন ওয়ার্ডে দাঁড়িয়ে থাকার মতো সম্মান আর তখন ওর অবশিষ্ট নেই।

জরুরী বিভাগে এসে আমি অযথাই একটু হৈ চৈ করলাম। ভবিষ্যতে এই সব ফাতরা পোলাপাইন আসলে যেন আমাকে না ডাকা হয়, এটা বলে আসলাম। (আমার সেদিনের এই আচরণে আমার হাসপাতালের সহকর্মীরা অনেকখানি সাহস পেয়েছিলো, সেটা বুঝতে পেরেছিলাম অনেক পরে।)

কোয়ার্টারে ফিরে আমি ফোন দিলাম আমার এলাকার কয়েকজনকে। উদ্দেশ্য যেন খুঁজে বের করা যায়, এই ছেলের আসল পরিচয়। আদৌ ছাত্রলীগ করে কী না। জানিয়ে রাখলাম উপজেলার ২ জন ছাত্রনেতাকে।

পরের দিন ঐ ছাত্রনেতার রোগীকে ছুটি দিলাম। ছুটি দেবার সময় খোঁজ নিলাম, ছাত্রনেতা এসেছেন কী না। সিস্টাররা জানালো, ও কাল রাতে আবার এসে ওয়ার্ডের সিস্টার, ইমারজেন্সীর স্টাফ সবার জন্য কোক আর কেক কিনে দিয়ে গেছে। আর সবার কাছে মাফ চেয়ে গেছে। কারন ঐদিন রাতে আমি হাসপাতালে আসার আগেই সে জরুরী বিভাগ এবং ওয়ার্ডের সিস্টার সবার সাথেই মিসবিহেভ করেছিলো।

আমার গল্প শেষ! এই গল্পটা এমন নাও হতে পারতো।

উপজেলা হাসপাতালে প্রতিরক্ষায় নৈশপ্রহরী ছাড়া আর কেউ থাকে না। রাতের বেলা মাত্র ৩/৪ জন মানুষ নিয়ে গিয়ে আপনি নির্বিঘ্নে ডাক্তার-সিস্টার পিটিয়ে আসতে পারবেন (ইহা পরীক্ষিত)।

এখন ধরুন, উপজেলা হাসপাতালে আনসার আছে এবং সরকারী কর্মচারীর সাথে দুর্ব্যবহার এবং সরকারী কাজে বাঁধাদানের কারনে আমাদের হাসপাতালের আনসার কাউকে আটক করলো। মুহুর্তে মধ্যে উপজেলা/ইউনিয়ন পর্যায়ের ১০০ নেতাকর্মী হাসপাতালে আসলো। আমার সরকারী কোয়ার্টারে বা সিস্টারের সরকারী কোয়ার্টারে ঢিল ছুঁড়তে লাগলো। জরুরী বিভাগ ভাঙচুর করা হলো (ইহা তো ডাইল-ভাত বাংলাদেশে) এবং আমাকেসহ হাসপাতালের কর্মরতদের শারীরিকভাবে আহত করা হলো।

গল্পটা এমন হতে পারতো না?

আমি যা করেছি, তার আগাগোড়াই অন্যায় ছিলো, অপ্রয়োজনীয় ছিলো (আসলে এক প্রকার ফাঁপড় ছিলো) এবং অফিসার সুলভ ব্যবহার মোটেও ছিলো না। তবে এমন শ্বাপদসংকুল একটা অন্ধকার জনপদে, রাষ্ট্র যখন ঢাল তলোয়ার ছাড়া আমাকে পাঠাবে, তখন আমাকে আমার অফিসার ভিন্ন অন্য পরিচয়গুলোকে অবশ্যই ব্যবহার করতে হবে। কারন সেবা যেমন ধর্ম, আত্নরক্ষাও ধর্ম।

সুতরাং বরিশালের ঘটনা নিয়ে অনেক গভীরে ভাবতে হবে। অনেকটা গভীরে। পচনটা অনেকটা গভীরেই হয়।

আমি এখানেই শেষ করতে পারতাম লেখাটা। আরেকটু সেন্সিটিভ চিন্তার খোরাক দিয়ে শেষ করি।

বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন হয়। গ্রামেগঞ্জে বেশি হয়। মসজিদে আযান দিয়ে হিন্দু বাড়িতে আক্রমণ করে স্বাধীনতাবিরোধী একটি বিশেষ মহলের লোকজন। অন্য এলাকা থেকে বহিরাগতরা দলে দলে আসে। শ’য়ে শ’য়ে লোক ঝাঁপিয়ে পড়ে সংখ্যালঘু পরিবারের বাড়িঘরের উপর। সদর দরজা ভেঙ্গে তারা বাড়ির ভেতরে ঢুকে পরে। রাতের বেলা এই হামলায় সংখ্যালঘু পরিবারটির মানসিক অবস্থা চিন্তা করুন তো একবার।

আমার কথা শেষ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here