আধুনিকতার ছোঁয়ায় তারা এখন অসাহায়

0
219

শরিফুল ইসলাম ॥
মানুষ মাত্রই সুন্দরের পূজারী, আর এই সৌন্দর্যের অন্যতম উপকরণ হলো চুল-দাঁড়ি। এই কারণেই নরসুন্দরদের কদর ও প্রয়োজনীয়তা অনেক বেশি। চুল-দাঁড়ি কেটে মানুষকে দেখতে সুন্দর করাই যাদের কাজ, তারাই হলেন নরসুন্দর। তারা বর্তমান যুগে আমাদের কাছে নাপিত হিসেবে পরিচিত। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় হরিয়ে যাচ্ছেন তাঁরা।
আধুনিকতার ছোঁয়ায় আমাদের দৈনন্দিন জীবনের গতিধারায় এসেছে পরিবর্তন। আধুনিকতার ছোঁয়ায় গড়ে উঠেছে আধুনিক মানের সেলুন। সবাই ঝুঁকছেন সেই সব সেলুনগুলোর দিকে। আগে হাট-বাজার, ফুটপাত ও গ্রামগঞ্জে সাজানো পিঁড়িতে বসে চুল-দাঁড়ি কাঁটত নরসুন্দররা। এখন আর সচরাচর চোখে পড়ে না। বিলুপ্তের পথে আবহমান কাল ধরে চলে আসা এই গ্রামীণ ঐতিহ্য।
রাজবাড়ীর পাংশার বিভিন্ন হাটে চোখে পড়ে চীর চেনা এই দৃশ্য। দির্ঘ অপেক্ষার পর মিলছে খোদ্দের। বর্তমানে অসহায় জীবন যাপন করছে তারা।
উপজেলায় এই পুরনো ওইতিহ্য ধরে রেখেছেন তিন নরসুন্দর। তারা হলেন, উপজেলার পাট্টা ইউনিয়নের বিনয় কুমার বিশ্বাস (৭০) মৌরাট ইউনিয়নের আব্দুল গনি বিশ্বাস (৬০) ও মাজেদ বিশ্বাস (৬৫) । পাংশা উপজেলার বৃত্তিডাঙ্গা বাজারে গেলে খোলা আকাশের নিচে ক্ষুর, কেঁচি, চিরনী নিয়ে বসে অপেক্ষা করতে দেখা যায় তাদের। হাট কর্তৃপক্ষকে ১০ টাকা দিয়ে একটি রাস্তার উপর বসে আছেন তারা।
তাদের সাথে কথা বলে জানাযায়, তাদের পরে এই পুরনো ঐতিহ্য ধরে রাখার মত আর কেউ নেই। উপজেলার পাংশা (পুরাতন বাজার), বাগদুলী বাজার ও বৃত্তিডাঙ্গা বাজারে চুল-দাঁড়ি কটেন তারা। এই বাজার গুলোতে সাপ্তাহে দুই দিন করে হাট বসে। তিনটি হাটে সাপ্তাহে ছয় দিন কাজ করেন তারা। খোদ্দের না থাকায় অসহায় জীবন যাপন করছেন তারা।
যুদ্ধের পর থেকে এ পেশায় আছেন মাজেদ বিশ্বস। তিনি বলেন, অনেক বছর আগে চুল কাটা বাবদ দিতে হতো চার পয়সা আর দাঁড়ি কাটার জন্য দু পয়সা। সে সময় যা আয় হতো তা দিয়ে ভালোভাবেই সংসার চলতো। কিন্তু বর্তমানে ২০-৩০ টাকায় চুল আর ১০ টাকা দাঁড়ি কেটেও সারা দিন যে টাকা উপার্জন হয়। তা দিয়ে জীবিকা নির্বাহে হিমশিম খেতে হয়। অন্য কোন কাজ করতে পারি না হাটের সময় হলে এসে খোদ্দেরের অপেক্ষায় বসে থাকি।
আব্দুল গনি বিশ্বাস বলেন, এখন আর কেউ খোলা আকাশের নিচে বসে চুল-দাঁড়ি কাটতে চায় না কেউ। বর্তমানে মানুষের রুচিতে পরিবর্তন এসেছে। সেই সাথে চুল-দাঁড়ি কাটার সরঞ্জাম ও যন্ত্রপাতিও পরিবর্তন হয়েছে। সেলুনে এখন আর শান দেওয়া ক্ষুর দেখাই যায় না। তার বদলে এসেছে ব্লেড লাগানো ক্ষুর। এসেছে শেভিং ক্রিম, লোশন ব্লোয়ার ও চুলের কলপ। আমি যখন এ কাজ শুরু করেছি তখন এগুলো মানুষের কাছে ছিল কল্পনাহীন।
বিনয় কুমার বিশ্বাস বলেন, আগে পান পাতার ব্যবসা করতার। তখন ভালই চলতো পান পাতার ব্যবসা। পান পাতার ব্যবসা যখন বাদ হয়ে গেল তার পর থেকে প্রায় ২০ বছর ধরে এই চুল-দাঁড়ি কাটি। এখন খোদ্দের পাওয়া যায় না বলেই চলে। সারা দিনে যে কাজ হয় তা দিয়ে সংসার চলে না। একটা কাজের মধ্যে থাকতে হবে তাই করি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here