করোনার থাবা প্রমান করে বঙ্গবন্ধুর কৃষি-উন্নয়ন দর্শন কতটা সঠিক ছিল

0
167
লেখকঃ ড. অপূর্ব কান্তি চৌধুরী (আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন গবেষক ও কৃষিবিদ) মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, বীজ প্রযুক্তি বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, গাজীপুর। ইমেইলঃ apurba.chowdhury@gmail.com

পরাধীনতার শেকলে বন্দী হয়ে অত্যাচারী শাসকের নির্মমতায় বাংলার মাটি যখন নিস্পেষিত, তখনই বাংলার আকাশে উদিত হন বাংলার অবিসংবাদিত নেতা ইতিহাসের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, স্বাধীনতার মহান স্থপতি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

স্বাধীনতা বিপ্লবের ডাক দেওয়া মহান নেতা বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা পরবর্তী স্বপ্ন ছিল ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলাদেশ গড়া। হাজার বছরের অবহেলিত ও শোষিত ছিল এ বাংলার মানুষের আর্থসামাজিক উন্নয়ন।  জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর দূরদর্শিতায় অনুধাবন করেছিলেন কৃষির উন্নতিই হচ্ছে কৃষকের অর্থনৈতিক মুক্তি।

সে কারণেই স্বাধীনতার পরই তিনি সবুজ বিপ্লবের ডাক দিয়েছিলেন। ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন। জাতির পিতা খাদ্যে স্বয়ংস¤পূর্ণতা অর্জনের লক্ষ্য নিয়ে বলেছিলেন, “খাদ্যের জন্য অন্যের উপর নির্ভর করলে চলবে না। আমাদের নিজেদের প্রয়োজনীয় খাদ্য আমাদেরই উৎপাদন করতে হবে। আমরা কেন অন্যের কাছে খাদ্য ভিক্ষা চাইব। আমাদের আছে উর্বর জমি, অবারিত প্রাকৃতিক সম্পদ, আমাদের পরিশ্রমী মানুষ, আমাদের গবেষণা সম্প্রসারণ কাজে সমন্বয় করে আমরা খাদ্যে স্বয়ম্ভরতা অর্জন করব। এটা শুধু সময়ের ব্যাপার”। (সূত্র কৃষি ও কৃষকের বঙ্গবন্ধু, ড. সামসুল আলম, পৃষ্ঠা-৪৩) সময়ের পরিক্রমায় বঙ্গবন্ধু কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কর্তক বঙ্গবন্ধুর উন্নয়ন দর্শন বাস্তবায়নে তার নেতত্বে দেশ আজ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ।

করোনার থাবায় বিশ্ব যখন সবদিক দিয়ে ধুকছে। বিশ্বের শতকোটি মানুষ ক্ষুধানিয়ে ঘুমাতে যাচ্ছে। তখন যদিও দেশের আবাদি জমি কমেছে, জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে দ্বিগুণ কিন্তু খাদ্য উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ৪ গুণ। দানাদার জাতীয় খাদ্যশস্যের সয়ংসম্পূর্ণ উৎপাদনে বাংলাদেশের মানুষের তখন খাদ্য নিয়ে ভাবতে হচ্ছে না। শুধু দানাদার খাদ্যশস্য নয় এ সময়ে বিশ্বের মধ্যে ধান উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে ৩য়, সবজি উৎপাদনে ৩য়, আম উৎপাদনে ৭ম, আলু ও পেয়ারা উৎপাদনে ৮ম অবস্থানে অবস্থান করছে। বঙ্গবন্ধু তার উন্নয়ন দর্শনে সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত দেশকে সুন্দরভাবে গড়ে তুলতে খাদ্য নিরাপত্তাকে সর্ব্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন। কৃষি ও কৃষকের উন্নয়নের জন্য তিনি বিভিন্ন উদ্যোগ ও কর্মসূচি গ্রহণ করেন। বঙ্গবন্ধুর উন্নয়ন পরিকল্পনা ও তার পরিপ্রেক্ষিত গুলোর মধ্যে বঙ্গবন্ধু কৃষকদের ২৫ বিঘা পর্যন্ত জমির খাজনা মওকুফ করেন।

ভূমিস্বত্ব আইন জারি করার মাধ্যমে পরিবার প্রতি ভ‚মি মালিকানা ৩৭৫ একর থেকে কমিয়ে সর্বোচ্চ ১০০ বিঘা সিলিং আরোপ করেন। গরিব কৃষকদের  সহায়তার উদ্দেশ্যে সুদমুক্ত ঋণের ব্যবস্থা করেছিলেন। বঙ্গবন্ধুর সরকারের প্রথম বার্ষিক বাজেটে  ১৯৭২-৭৩ সালে ৫০০ কোটি টাকা উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ ছিল এর মধ্যে ১০১ কোটি টাকা শুধু কৃষি উন্নয়নের জন্য রাখা হয়েছিল।

কৃষি ও কৃষকদের উন্নয়নে তিনি প্রথম বাজেটে  কৃষিখাতে ভর্তুকির ব্যবস্থা করেন। বাজেটে ভর্তুকি দিয়ে বিনামূল্যে কীটনাশক ও সার সরবরাহ করেন। এ ছাড়াও ইউনিয়ন পর্যায়ে কৃষিকর্মী নিয়োগ করেছিলেন তিনি। কৃষি পণ্য বিশেষ করে ধান, পাট, আখের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে ন্যূনতম ন্যায্যমূল্য বেঁধে দিয়েছিলেন। গরিব কৃষকদের রেশনের ব্যবস্থা করেছিলেন। সবুজ বিপ্লব কর্মসূচির আওতায় খাদ্য ঘাটতি কমিয়ে আনার নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন তিনি। সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত দেশের প্রায় ৪০ লাখ টন খাদ্যঘাটতি পূরণে বঙ্গবন্ধু তাৎক্ষণিক আমদানির মাধ্যমে ও স্বল্পমেয়াদে উন্নত চাষাবাদের প্রেক্ষিতে উন্নতবীজ, সেচ ও অন্যান্য কৃষি উপকরণ সরবারহ করেন।

এ ছাড়াও কৃষি  ঋণ মওকুফ, সার্টিফিকেট মামলা প্রত্যাহার ও খাসজমির বিতরণের মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর উদ্যোগ গ্রহণ করেন। প্রাতিষ্ঠানিক কৃষি উন্নয়নের লক্ষ্যে তিনি বিভিন্ন কৃষিভিত্তিক প্রতিষ্ঠান যেমন কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল, উদ্যান উন্নয়ন বোর্ড, তুলা উন্নয়ন বোর্ড, বীজ প্রত্যয়ন এজেন্সি, ইক্ষু গবেষণা প্রতিষ্ঠান মৎস উন্নয়ন কর্পোরেশনসহ অনেক নতুন প্রতিষ্ঠান গঠন করেন।

কৃষি শিক্ষা ও পেশায় মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীদের আকৃষ্ট করতে ১৯৭৩ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ময়মনসিংহে কৃষি গ্রাজুয়েটদের উদ্দেশে এক দিকনির্দেশনামূলক ভাষণে কৃষি গ্রাজুয়েটদেরকে দেশের সরকারী চাকুরিতে প্রথম শ্রেণীর মর্যাদা প্রদান করেন।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু দেশ ও কৃষি উন্নয়নে বলেছিলেন আমাদের আর্থ-সামাজিক কারণে দেশে দিনদিন জমির বিভাজন বেড়ে চলেছে। যদি সমন্বিত কষি খামার গড়ে তোলা না যায় তাহলে আমাদের কৃষি উন্নয়ন ব্যাহত হবে, আমরা আমাদের কাক্সিক্ষত উৎপাদন নিশ্চিত করতে পারব না । সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখে তিনি গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন গ্রামভিত্তিক বহুমুখী সমবায়। ১৯৭২ সালের ৫ এপ্রিল বাংলাদেশ বেতারে দেশ আমার মাটি   আমার অনুষ্ঠানের বক্তৃতায় তিনি গ্রামে বহুমুখী  কো-অপারেটিভ করার রূপরেখা তুলে ধরেন।

১৯৭৫ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অনুষ্ঠিত জনসভায় বঙ্গবন্ধু সমবায় সংক্রান্ত তাঁর প্রস্তাবটি জনসমক্ষে তুলে ধরেন। এই বক্তৃতায় তিনি বলেন “আমি ঘোষণা করছি যে, পাঁচ বছরের প্লান (পরিকল্পনায়) প্রত্যেকটি গ্রামে ক¤পলসারি (বাধ্যতামূলক)    কো-অপারেটিভ হবে। বাংলাদেশে ৬৫ হাজার গ্রাম কো-অপারেটিভ হবে। প্রত্যেকটি মানুষ যে কাজ করতে পারে তাকে এই কো-অপারেটিভের সদস্য হতে হবে। গ্রামে গ্রামে বহুমুখী কো-অপারেটিভ করা হবে”।

পাশাপাশি  কৃষি উৎপাদনে  প্রয়োজনীয় আধুনিক যন্ত্রপাতির প্রয়োজনীয়তা তিনি অনুভব করেছিলেন। উন্নত, সুখী ও সমৃদ্ধশালী সোনার বাংলা গড়ার বঙ্গবন্ধুর লালিত স্বপ্নকে ধারণ করে বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার জনবান্ধব সরকার কৃষি বান্ধব নীতি ও পরিকল্পনা গ্রহণ করছেন। তিনি করোনা ভাইরাসজনিত বিশ্ব

মহামারিতে এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের নানা প্রতিক‚লতার মধ্যেও বাংলাদেশে আধুনিক কৃষি অগ্রযাত্রাকে অব্যাহত রেখেছেন ফলস্বরূপ কৃষি ক্ষেত্রে এক অসাধারণ বিস্ময়কর সাফল্য অর্জিত হয়েছে। যার প্রেক্ষিতে করোনার কঠিন থাবায় বিশ্বের অনেক দেশে স্বাস্থ্যের পাশাপাশি খাদ্য উৎপাদন ও বন্টন ব্যবস্থায় সমস্যা হলেও বাংলাদেশের মানুষকে খাদ্য নিয়ে ভাবতে হচ্ছে না। বিবিএস প্রকাশিত জিডিপির প্রবৃদ্ধির ফলাফলে এর প্রতিফলন পাওয়া গেছে।  ০৫ আগস্ট, ২০২১ বিবিএস থেকে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে যেখানে মূলত সব খাতেই করোনার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে সেখানে ব্যতিক্রম শুধুমাত্র কৃষি ক্ষেত্রে।

চূড়ান্তভাবে ২০১৯-২০ অর্থবছরে কৃষিখাতে ৯ দশমিক ৭৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। গত অর্থবছরে যা ছিল ৯ দশমিক ৫৭ শতাংশ। ফলে করোনা সংকটেও অর্থনীতির চাকা সচল ছিল  কৃষিখাতে। করোনা সংকটের মধ্যে দেশকে মূলত বাঁচিয়ে রেখেছে কৃষিখাত। করোনাকালীন সময়ে বিশ্ব অর্থনীতি যেখানে বিপর্যস্ত ছিল সেখানে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির এই অর্জন সত্যিই  প্রসংশনীয়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্ব, জাতির পিতার দেখা সোনার বাংলাকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিয়ে চলেছে দৃপ্ত পদক্ষেপে। কৃষিবান্ধব এ সরকারের বিচক্ষণতা ও দৃঢ় প্রত্যয়ে কৃষিতে বিশ্বসেরা স্থান দখলের পথে হেটে চলেছে বাংলাদেশ।

লেখকঃ ড. অপূর্ব কান্তি চৌধুরী (আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন গবেষক ও কৃষিবিদ) মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, বীজ প্রযুক্তি বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, গাজীপুর। ইমেইলঃ apurba.chowdhury@gmail.com

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here