1. jitsolution24@gmail.com : Rajbaribd desk : Rajbaribd desk
বৃহস্পতিবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০১:৫৩ পূর্বাহ্ন

কথা রাখছে না বিদ্যুত বিভাগ

রাজবাড়ীবিডি ডেক্স ॥
  • Update Time : বুধবার, ১৭ আগস্ট, ২০২২
  • ১৪৬ Time View

সরকারের ব্যয় সাশ্রয়ী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে সারা দেশে শুরু হয়েছে পূর্ব ঘোষিত সময়সূচি ধরে ১/২ ঘণ্টা করে লোডশেডিং। তবে নির্ধারিত সময়সূচীর বিন্দুমাত্র ঠিক রাখতে পারছে না বিদ্যুত বিভাগ। বিদ্যুত বিভাগের পক্ষ থেকে ১/২ ঘণ্টা করে লোডশেডিংয়ের ঘোষনা দেয়া হলেও দফায় দফায় হচ্ছে লোডশেডিং। যখন খুশি তখন চলে যাচ্ছে বিদ্যুত। গ্রামাঞ্চলের লোডশেডিংয়ের অবস্থা আরো ভয়াবহ।
পল্লী বিদ্যুতের গ্রাহকরা বলছেন, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ৫ থেকে ৯ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুত থাকছে না। রাতের বেলায়ও ঘন্টার পর ঘন্টা লোডশেডিং হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন তীব্র গরমে জনজীবন বিপযস্ত হয়ে পড়ছে, অপরদিকে আমনের সেচ ব্যবস্থা ব্যাহত হয়ে কৃষি খাতে বিরূপ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিদ্যুত না থাকায় গরমে রাতেও ঘরে থাকতে পাড়ছে খেটে খাওয়া মানুষ। বেশি বিপাকে পড়েছে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার্থীরাসহ অন্যান্য শিক্ষার্থীরা।
বিদ্যুত বিভাগ দাবি করেছে, চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ না পাওয়ায় গ্রাহকদের সিডিউল ঠিক রাখতে পারছেন না তারা। এদিকে আমন ধান চাষ মৌসুম শুরু হওয়ায় এমনিতেই অনাবৃষ্টির কারনে সম্পুর্ন সেচের উপর নির্ভর করতে হচ্ছে রাজবাড়ীর কৃষকদের। লোডসেডিংয়ের কারণে আমন ধানের ফলন বিপর্যায় হওয়ার আশঙ্কা করছেন কৃষকরা।
রাজবাড়ী জেলার সর্ব দক্ষিণের উপজেলা বালিয়াকান্দি। বিদ্যুত বিভাগ কর্তৃক লোডশেডিংয়ের ঘোষিত সময়সূচী অনুযায়ী প্রতিদিন সন্ধ্যা ৭টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত লোডশেডিং থাকার কথা। কিন্তু এই উপজেলায় কোন কোন দিন ৮ ঘন্টারও বেশী সময় লোডশেডিং থাকছে। এতেকরে এখানকার সকল ধরনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে চরম নেতিবাচক প্রভাব পড়ার পাশাপাশি জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে।
সরেজমিন বালিয়াকান্দি উপজেলার জামালপুর ইউনিয়নের নলিয়া ডাঙ্গাহাতিমোহন গ্রামের গিয়ে দেখা যায়, প্রত্যন্ত এই গ্রামে ২০১৫ সালে জলিল মিয়া জুট মিলস লিমিটেড নামের একটি শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। সহজে শ্রমিক পাওয়া, ভালো বিদ্যুত সরবরাহসহ নানা কারণে কয়েক বছরে এই শিল্প প্রতিষ্ঠানটি মোটামুটি ভালোই চলছিল। কিন্তু বিদ্যুতের এই ভয়াবহ সংকটে শিল্প প্রতিষ্ঠানটি লোকসানের ঝুকিতে পড়েছে। জলিল মিয়া জুট মিলস লিমিটেডের অফিস সূত্র জানায়, তাদের জুট মিলটা ২০ ফ্রেমের। এর মধ্যে ৭-৮টি ফ্রেম চালু থাকলে প্রতিদিন ২৪ ঘন্টায় গড়ে বিদ্যুতের প্রয়োজন হয় ২৩০০ থেকে ২৪০০ ইউনিটের মতো। পল্লী বিদ্যুতের নির্ধারিত বানিজ্যিক মূল্য হিসেবে মোট বিদ্যুতের খরচ প্রতিদিন ৩২ হাজার ২০০ টাকা থেকে ৩৫ হাজার ১০০ টাকা।
আর ৬৫০ কিলোওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন জেনারেটর চালাতে প্রতি ঘন্টায় ডিজেল লাগে ৫২-৫৫ লিটার। ২৪ ঘন্টায় ডিজেল লাগে ১২৪৮ থেকে ১৩২০ লিটার পর্যন্ত। যার বর্তমান বাজার মূল্য (১১৫ টাকা লিটার) ১ লাখ ৪৩ হাজার ৫২০ টাকা থেকে ১ লাখ ৫১ হাজার ৮০০ টাকা।
জলিল মিয়া জুট মিলস লিমিটেডের ম্যানেজিং ডিইরেক্টর (এমডি) এ.কে.এম ফরিদ হোসেন বাবু জানান, জ¦ালানী সংকট মোকাবেলায় বিদ্যুতের উৎপাদন বন্ধ রেখে লোডশেডিং কোন সমাধান হতে পারে না। কারণ লোডশেডিংকালীন সময় জেনারেটরে জ¦ালানী তেল খরচ করে বিদ্যুত সরবরাহ নিশ্চিত করতে হচ্ছে। এজন্য জ¦ালানী তেল কিনতেই হচ্ছে। এতে আরো জ¦ালানী অপচয় হচ্ছে। লোডশেডিং কালীন সময়ে জেনারেটর দিয়ে এক লিটার ডিজেলে যে পরিমান বিদ্যুত উৎপাদন করতে হয়, বিদ্যুতকেন্দ্র গুলো ওই একই জ¦ালানীতে তার চেয়ে অনেক বেশী বিদ্যুত উৎপাদান করতে পারে।
রাজবাড়ী পল্লী বিদ্যুত সমিতি থেকে সরবরাহকৃত বালিয়াকান্দিতে চলতি মাসের লোডশেডিংয়ের চিত্রে দেখা যায়, ১ আগস্ট ৪ ঘন্টা ৪০মিনিট, ২ আগস্ট ৩ ঘন্টা ৫৭ মিনিট, ৩ আগস্ট ৫ ঘন্টা ২১ মিনিট, ৪ আগস্ট ৮ ঘন্টা ৫৬ মিনিট, ৫ আগস্ট ২ ঘন্টা ৪৬ মিনিট, ৬ আগস্ট ২ ঘন্টা ৪৬ মিনিট, ৭ আগস্ট ৩ ঘন্টা ১৪ মিনিট, ৮ আগস্ট ২ ঘন্টা ৪৩ মিনিট, ৯ আগস্ট ৩ ঘন্টা ৯ মিনিট, ১০ আগস্ট ২ ঘন্টা ২ মিনিট, ১১ আগস্ট ১ ঘন্টা ৯ মিনিট লোডশেডিং ছিল।
অপরদিকে ওয়েস্ট্রান জোন পাওয়ার ডিসট্রিভিউশন কোম্পানী লি: এর সরবরাহকৃত বিদ্যুতের গত শনিবার (১৩ আগস্ট) বালিয়াকান্দিতে রাত ১২টা থেকে ২টা পর্যন্ত লোডশেডিং চলে। এরপর সকাল সাড়ে ৮টায় বিদ্যুত চলে যায়, টানা সাড়ে ৭ ঘন্টা পর বিকেল ৩টায় বিদ্যুত আসে। আবার বিকেল ৫টা ৫১ মিনিটে লোডশেডিং শুরু হয়ে ৬টা ৮ মিনিটে বিদ্যুত আসে। ফের রাত ৯টা ৬ মিনিটে লোডশেডিং শুরু হয়ে ৯টা ১৮ মিনিটে বিদ্যুত আসে। রোববার (১৪ আগস্ট) বেলা ১০টা ৪১ মিনিটে লোডশেডিং শুরু হয়ে শেষ হয় দুপুর ১টায়। ফের ৩টা ৪১ মিনিটে লোডশেডিং শুরু হয়।
এদিকে বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ের শিকার হয়ে ক্ষতির মুখে পড়েছেন বালিয়াকান্দির ক্ষুদ্র উৎপাদানশীল শিল্প প্রতিষ্ঠানের মালিকরা। ওয়েস্ট্রান জোন পাওয়ার ডিসট্রিভিউশন কোম্পানী লি: এর সরবরাহকৃত বিদ্যুতের ক্ষনে ক্ষনে লোডশেডিংয়ের কারনে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় ক্ষতির শিকার হচ্ছেন স্বল্প পুজিরর উদ্যোক্তরা। সরেজমিন বালিয়াকান্দি বাজারের বন্যা ফুড প্রোডাক্টস নামের খাদ্য সামগ্রী উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানে গিয়ে দেখা যায়, বিদ্যুত না থাকার কারণে প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ৫ জন কর্মচারী কর্মহীন হয়ে বসে আছে। মিক্সার মেশিন সহ অন্যান্য মেশিনারীজ লোডশেডিং চলাকালে তাদের বিকল্প কোন ব্যবস্থা নাই। তাই তাদের বিদ্যুত না থাকলে বসে বসে বিদ্যুতের অপেক্ষা করতে হয়। এসময় কথা হয় প্রতিষ্ঠানের মালিক হাসিবুর রহমানের সাথে। তিনি জানান, বিদ্যুতের এই পরিস্থিতিতে আমাদের মত ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ব্যবসা চালানো অনেকটা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। বিদ্যুত না থাকলে শ্রমিকরা বসে থাকতে বাধ্য হয়। এতে উৎপাদিত পন্যের উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়। কিন্তু পণ্যের দাম একই আছে। প্রতিযোগিতামূলক বাজারে ইচ্ছে করলেও দাম বাড়ানো যায় না। এতে তাদের প্রতিদিনই লোকসান গুনতে হচ্ছে।
অপরদিকে বর্তমানে চলছে আমন ধান চাষের ভরা মৌসুম। একদিকে রাজবাড়ী জেলায় অপেক্ষাকৃত অনাবৃষ্টি অপরদিকে চরম বিদ্যুত সংকটে আমন ধানের ফলন বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। আলাপকালে বালিয়াকান্দি উপজেলা জামালপুর ইউনিয়নের গোষাই গোবিন্দ পুর গ্রামের কৃষক খোকন শেখ জানান, আমন চাষের মৌসুম শুরুর পর থেকেই দিনে-রাতে যখন তখন বিদ্যুত চলে যাচ্ছে। এতেকরে ধান ক্ষেতে সেচ ব্যবস্থা একরকম ভেঙ্গে পড়েছে। দেখা যাচ্ছে যখন ক্ষেতে পানি দেয়া প্রয়োজন, দিতে পারছি না, দিতে দিতে কয়েক ঘন্টা দেরি হয়ে যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে হয়ত আমন ধানের ফলন ঠিক মত পাওয়া যাবে না। এসময় তিনি ক্ষোভের সাথে বলেন, ‘লোডশেডিংয়ের যন্ত্রনায় রাতে ঘরেও থাকতে পারছি না। একটু ভালো করে লেখেন, যাতে আমরা অন্তত রাতে একটু ঘুমাতে পারি।’
এ প্রসঙ্গে রাজবাড়ী জেলা কৃষি বিভাগের উপ পরিচালক শহীদ নুর আকবর লোডসেডিংয়ের কারণে আমন চাষ ব্যাহত হওয়ার কথা স্বীকার করে বলেন, মৌসুমের শুরুতে বৃষ্টিপাত কম হলেও আগামী কয়েকদিন ভালো বৃষ্টিপাত হবে বলে আশা করছি। পর্যাপ্ত বৃষ্টি হলে আমন চাষে কোন অসুবিধা হবে না। আগামী সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত আমন ধান রোপন করা যাবে। এছাড়া বোরো ধানের তুলনায় আমন ধান চাষে অপেক্ষাকৃত কম সেচ লাগে বলে তিনি জানান।
সরেজমিন বালিয়াকান্দিতে বিদ্যুত বিভাগের কার্যালয়ের সন্ধান করলে জানা যায়, এই উপজেলায় বিদ্যুত বিভাগের কোন অফিস নেই। রাজবাড়ী জেলা শহর থেকে কার্যক্রম চালানো হয়। এসময় স্থানীয় সাংবাদিক সোহেল রানা জানান, বালিয়াকান্দিতে বিদ্যুত অফিস না থাকায় দীর্ঘদিন ধরে উপজেলাবাসীর ভোগান্তির সীমা নেই। ছোট-বড় সকল ধরনের সমস্যার জন্য এ এলাকার গ্রাহকদের রাজবাড়ী জেলা সদরে ঘুরতে হয়। এতেকরে ভোগান্তির পাশাপাশি অতিরিক্ত অর্থ খরচসহ সময়ের অপচয় হয়।
রাজবাড়ী পল্লী বিদ্যুত সমিতির জেনারেল ম্যানেজার মো. মফিজুর রহমান জানান, রাজবাড়ী জেলার পল্লী বিদ্যুতের ২ লাখ ১৫ হাজার গ্রাহকের জন্য প্রতিদিন তাদের ৪৫ মেগাওয়াট বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়। এর বিপরীতে তারা পান ২৮ মেগাওয়াট। স্বাভাবিক কারণেই তাদের লোডশেডিং দিতে বাধ্য হন। এক্ষেত্রে তাদের অন্য কোন বিকল্প নাই। প্রতিনিয়ত রাজবাড়ীর জন্য বিদ্যুতের সরবরাহ বাড়ানো তাগিদ দিলেও তা পাচ্ছেন না।
ওয়েস্ট্্রান জোন পাওয়ার ডিসট্রিভিউশন কোম্পানী লি: এর উপসহকারী প্রকৌশলী (বালিয়াকান্দি) বাপ্পি দাস জানান, বালিয়াকান্দিসহ রাজবাড়ী জেলার কয়েকটি এলাকায় তাদের সাবস্টেশন থেকে বিদ্যুত সরবরাহ করা হয়। নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুত সরবরাহের জন্য তাদের প্রয়োজন হয় অন্তত ২৪ মেগাওয়াট বিদ্যুত। কিন্তু তারা পান মাত্র ১২ মেগাওয়াটের মত। এতেকরে অঞ্চল ভাগ করে লোডশেডিং দিতেই হয়। অপরদিকে সময় বিশেষ বিদ্যুতের চাহিদা বাড়া-কমার কারণে সিডিউল মেনে লোডশেডিং দেয়া সম্ভব হয় না। অনেক সময় সিডিউলে থাকলেও লোডশেডিং দিতে হয় না। আগামী ১ মাসের মধ্যে লোডশেডিংয়ের সময় অনেকাংশে কমে আসবে বলে তিনি জানান।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
Design by: JIT Solution