1. jitsolution24@gmail.com : Rajbaribd desk : Rajbaribd desk
সোমবার, ০৫ ডিসেম্বর ২০২২, ০৯:১৭ অপরাহ্ন

গোয়ালন্দের কুশাহাটা চরের শিশুরা শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত, নেই স্বাস্থ্য সেবার মত মৌলিক অধিকার!

স্টাফ রিপোর্টার ॥
  • Update Time : শনিবার, ১ অক্টোবর, ২০২২
  • ২১৭ Time View

গোয়ালন্দ উপজেলার মূল ভুখন্ড থেকে বিচ্ছিন্ন এক দ্বীপের নাম কুশাহাটা চর। এই চরের হত দরিদ্র মানুষ একদিকে যেমন স্বাস্থ্য সেবাসহ বিভিন্ন মৌলিক নাগরিক সুবিধা বঞ্চিত, অন্যদিকে এখানকার কয়েকশ শিশু শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত।
জানা যায়, গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া ইউনিয়নের পদ্মার বুকে জেগে ওঠা বিশাল চর কুশাহাটা। এখানে ৭/৮ বছর আগে বসতি শুরু হয়। এক এক করে বর্তমানে এই চরে ১৩০টি পরিবারের সহ¯্রাধিক মানুষ বসবাস করছে। এখানে বসবাসকারীদের নিজস্ব কোন জমি নেই, নেই হাট-বাজার, রাস্তা-ঘাট, চিকিৎসা কেন্দ্র ও কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এ চরের বাসিন্দাদের প্রধান পেশা কৃষি ও মৎস্য শিকার। অনেকের বাপ-দাদার জমি নদী ভাঙ্গনের পর আবার জেগে ওঠায় ফের বসতি গড়েছেন কুশাহাটা চরে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নৌকাতে তাদের পদ্মা নদী পাড়ি দিয়ে আসতে হয় মূলভূখন্ডে।
সরেজমিন দেখা যায়, দৌলতদিয়া ফেরিঘাট থেকে ৮/১০ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে পদ্মার চরে কুশাহাটা এলাকা। ঝড়-বৃষ্টি ও নদীর সাথে যুদ্ধ করেই চলে চরবাসীর জীবন-জীবিকা। কুশাহাটা চরে কয়েকশ শিশু থাকলেও এ সকল শিশুদের শিক্ষার জন্য নেই কোন সরকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থা পায়ক্ট বাংলাদেশের উদ্যোগে একজন শিক্ষক দিয়ে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে একটি প্রি প্রাইমারী স্কুল। যে স্কুলে দেড় শতাধিক শিক্ষার্থী থাকলেও নেই কোন স্কুলঘর ও অন্যান্য সুযোগ সুবিধা। ছেঁড়া চটের চাদোয়া ও ছেঁড়া চটের উপরেই চলে শিশুদের পাঠদান। যেখানে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা শতভাগ উপবৃত্তি পায়, সেখানে এ সকল শিশুদের প্রতিমাসে ১শ টাকা করে বেতন পরিশোধ করতে হয়। অথচ এ সকল শিশুর অভিভাবকদের দু’বেলা খাবার জোটানোই মুশকিল। এই স্কুলে ৪র্থ শ্রেণি পর্যন্ত পড়ানো হয়। চরের শিশুদের ৪র্থ শ্রেণির পরে আর পড়ালেখা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকে না। কারণ অন্তত ৭/৯ কিলোমিটার নদী পথ পারি দিয়ে কোন স্কুলে যেতে হয়। সেটা অনেকটা অসম্ভব ব্যাপার। দু’একজন আত্মীয় স্বজনের বাড়িতে থেকে পড়াশুনা করলেও অন্য সবারই শিক্ষা জীবনের ইতি ঘটে ৪র্থ শ্রেণিতেই।
ওই স্কুলের শিক্ষক মো. ওয়াজ উদ্দিন সরদার। তার শিক্ষাগত যোগ্যতা এসএসসি পাশ। তিনি জানান, পায়াক্ট বাংলাদেশ এনজিও থেকে তাকে সামন্য কিছু সম্মানী দেয়াসহ বই-খাতা সরবরাহ করা হয়। আর শিক্ষার্থীদের দেয়া বেতন থেকেই তিনি বেতন নেন। এখানকার সবাই অত্যন্ত গরীব। মাস শেষে সবাই ঠিক মত বেতনও দিতে পারে না। তিনি আরো জানান, ওরাদ-ঝড়-বৃষ্টি উপেক্ষা করে আমি বাড়ি বাড়ি গিয়ে ছাত্রছাত্রী সংগ্রহ করে পাঠদান করি। যে টাকা পাই তাতে তার সংসারও চলেনা। খুব কষ্ট হয়। তবুও চরের শিশুদের মাঝে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
স্থানীয় কিশোর রিপন মোল্লা (১২) জানায়, সে পায়াক্টের স্কুল থেকে ৪র্থ শ্রেণি শেষ করে রাজবাড়ী সদর উপজেলায় তার নানা বাড়িতে থেকে পড়াশুনা শুরু করেছিল। করোনার কারণে স্কুল বন্ধ হওয়ার সাথে সাথে তার পড়াশুনাও বন্ধ হয়ে যায়। এখন মাছ ধরাসহ বাবার কাজে সহযোগিতা করে সে। অপর কিশোর সুজন জানায়, ৪র্থ শ্রেণি শেষ করার পর আশপাশে স্কুল না থাকায় তার আর লেখাপড়া করা হয়নি।
স্থানীয় আব্দুস সালাম মন্ডল (৬৫) জানান, এক সময় এই কুশাহাটায় হাসপাতাল, পশু হাসপাতাল, স্কুলসহ রাস্তাঘাট সবই ছিল। ১৯৯৭-৮৮ সালের নদী ভাঙনে সে সবকিছুই পদ্মায় বিলীন হয়ে যায়। আবার ২০১৪-১৫ সালে ফের আবার চর জেগে ওঠে। আমরা অনেকেই আবার সেই চরে বসবাস শুরু করি। কিন্তু এখানে এখনো পর্যন্ত তেমন কোন নাগরিক সুবিধা প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
গোয়ালন্দ রাবেয়া ইদ্রিস মহিলা ডিগ্রী কলেজের অধ্যক্ষ মো. আব্দুল কাদের শেখ বলেন, কুশাহাটা চরের মানুষ নুন্যতম মানবিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত। বিশেষ করে এ চরের শিশুদের শিক্ষা গ্রহনের সুযোগ নেই বললেই চলে। এনজিও পরিচালিত একটি প্রি প্রাইমারী স্কুল থাকলেও তার খোলা আকাশের নিচে পাঠদান করে। বিষয়টি জেনে স্থানীয় সামাজিক সংগঠন গোয়ালন্দ ফাউন্ডেশন থেকে একটি কাঁচা ঘর নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তবে এটা কোন সমাধান না। তিনি চরবাসীর নাগরিক সুবিধা প্রতিষ্ঠিত করতে সংশ্লিষ্টদের কাছে দাবি করেন।
দৌলতদিয়া মডেল হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক মো. সহিদুল ইসলাম বলেন, মাননীয় প্রধান মন্ত্রীর ঘোষণা, একটি শিশুও স্কুলের বাইরে থাকবে না, এই কুশাহাটা চরে এই ঘোষণার বাস্তবায়ন জরুরী। এক সময় কুশাহাটায় সবই ছিল। নদী ভাঙনের সব বিলীন হয়ে গিয়ে পুনরায় জেগে উঠেছে। এখানে বসতি গড়ে উঠেছে। কিন্তু শিক্ষা-স্বাস্থ্যসহ মৌলিক অধিকার একেবারেই নিশ্চিত হয়নি।
বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থা পায়াক্ট বাংলাদেশ এর কর্মকর্তা শেখ রাজীব বলেন, কুশাহাটা চরের শিশুদের কোন প্রকার শিক্ষা সুযোগ না থাকায় তিনি উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষকে রাজি করে কোন দাতা সংস্থার সহায়তা ছাড়াই নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যদিয়ে একটি প্রি প্রাইমারি স্কুল চালিয়ে যাচ্ছেন।
পায়াক্ট বাংলাদেশ এর ম্যানেজার মজিবর রহমান জুয়েল বলেন, চারদিক উত্তাল পদ্মা-যমুনা নদী বেষ্ঠিত দূর্গম কুশাহাটা চরের শিশুদের মাঝে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে তারা ২০১৭ সাল থেকে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। এ বিষয়ে তাদের কোন প্রকল্প বা দাতা নেই। অভিভাবকদের সহযোগিতা ও পায়াক্টের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ব্যাক্তিগত অনুদানে শিক্ষককে যৎসামান্য বেতন দেয়া হয়। এছাড়া সরকারিভাবে বই সংগ্রহ করে বিতরন ও বছরের প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরন তারা দিয়ে থাকেন। মূলত শিক্ষক ওয়াজউদ্দিনের বাড়ির আঙ্গিনায় গাছতলাতেই চলে শিক্ষা কার্যক্রম।
গোয়ালন্দ উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোহাম্মদ জাকির হোসেন জানান, কুশাহাটা চরের শিশুরা যাতে শিক্ষা বঞ্চিত না হয়, সে লক্ষ্যে উপজেলা চেয়ারম্যান আলহাজ¦ মোস্তফা মুন্সি মহোদয় একটি জমি কিনে সেখানে ইতিমধ্যে মাটি ভরাটের কাজ শেষ করেছেন। স্কুলটি যাতে দ্রুত প্রতিষ্ঠিত করা যায় সে লক্ষ্যে প্রসাশন কাজ করছে। স্কুলটি প্রতিষ্ঠিত হলে সেখানেই একটি কক্ষে কমিউনিটি ক্লিনিক চালু করার কথা ভাবা হচ্ছে। স্বাস্থ্য সেবাসহ অন্যান্য নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করতে তারা আন্তরিক ভাবে কাজ করে যাচ্ছেন বলে তিনি জানান।
গোয়ালন্দ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আলহাজ¦ মোস্তফা মুন্সি এ প্রসঙ্গে জানান, সরকারী ভাবে বিভিন্ন নিয়ম-কানুন সম্পন্ন করে একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করা অনেকটা কঠিন ব্যাপার। তাই আমি ব্যাক্তিগত ভাবে গোয়ালন্দের দূর্গম চর কুশাহাটায় একটি স্কুল প্রতিষ্ঠার কাজ শুরু করেছি। জায়গা কিনে মাটি ভরাটের কাজ শেষ হয়েছে। আগামী মাসে শ্রেমীপাঁকা ঘর নির্মাণের কাজ শুরু হবে। ঘর নির্মাণ কাজ শেষ হলে, সেখানে আমি ব্যাক্তিগত ভাবে বেতন দিয়ে ৩/৪ জন শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে পাঠদান কার্যক্রম শুরু করব। একটি জনোগোষ্ঠী শিক্ষার সুযোগ থেকে যাতে বঞ্চিত না হয়, সেই লক্ষ্যেই আমি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
Design by: JIT Solution