1. jitsolution24@gmail.com : Rajbaribd desk : Rajbaribd desk
শুক্রবার, ২১ জানুয়ারী ২০২২, ০৪:১৮ অপরাহ্ন

বালিয়াকান্দিতে দরিদ্রদের দিন বদলে একটি বাড়ী একটি খামার প্রকল্প

Reporter Name
  • Update Time : শুক্রবার, ২৩ নভেম্বর, ২০১৮
  • ৬০৮ Time View

অর্থাভাবে দশম শ্রেণির পাঠ চুকিয়ে আর স্কুলমুখি হতে পারেননি আফছার শেখের পুত্র আলম শেখ। দরিদ্র মা-বাবার পরিবারে শৈশব থেকেই দু’টাকা রোজগারের উপায় খুঁজতে ব্যস্ত থাকতে হয়েছে আলমের। শিশু থেকে যৌবন পেরিয়ে যায় এভাবেই। জীবনের বাস্তবতায় বিয়ে করে সংসারী হতে হয় তাকে।
২০১৩ সালের জুন মাসে বালিয়াকান্দি উপজেলার নিজ গ্রাম পদমদীতে একটি বাড়ী একটি খামার প্রকল্পের সমিতি শুরু হওয়ার সময় তিনি সদস্য হয়ে যান। প্রথম ধাপে ১০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে একটি গরু ক্রয় করেন। পরবর্তীতে ২০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে তিনি কোয়েল পাখির চাষ শুরু করেন। আর ফিরে তাকাতে হয়নি পিছনে। বর্তমানে খামারে ১২শত সোনালী মুরগীর বাচ্চা ফুটিয়েছেন তিনি। আলম শেখের কাছে দারিদ্রতা আজ অতীত। একমাত্র মেয়ে রাফিয়া আলম ৫ম ও ৮ম শ্রেণিতে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পেয়ে ৯ম শ্রেণিতে লেখাপড়া করছে স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ে। সন্তানের লেখাপড়াসহ সংসারে সকল খরচ মিটিয়ে প্রতিমাসে তিনি ১০-১৫ হাজার টাকা সঞ্চয় করছেন।
শুধু আলম শেখই নন এমন হাজারো দরিদ্র পরিবারের স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন পূরণ করেছে একটি বাড়ী একটি খামার প্রকল্প।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অগ্রাধিকারমূলক ১০ উদ্যোগের অন্যতম হচ্ছে, ‘একটি বাড়ি একটি খামার’ প্রকল্প। ‘রূপকল্প-২০২১’ বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে ‘একটি বাড়ি একটি খামার’ প্রকল্প হাতে নেয়া হয়। এটির বাস্তবায়ন কাজ শুরু হয় ২০০৯ সালের জুলাই মাসে। প্রকল্পটির লক্ষ্য দারিদ্র্র্য দূরীকরণ, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন, স্থানীয় সম্পদ আহরন ও তার যথাযথ ব্যবহার, উন্নয়নমূলক ও আয়বর্ধক কর্মকা-ে গ্রামের দরিদ্র জনগোষ্ঠী বিশেষ করে নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।
দেশের ৪৯০টি উপজেলার ৪ হাজার ৫০৩ ইউনিয়নের ৪০ হাজার ৫২৭ টি গ্রামে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হচ্ছে। একটি বাড়ী একটি খামারের ওয়েবসাইটের তথ্য মতে প্রকল্পের আওতায় দেশজুড়ে এ পর্যন্ত মোট ৭৯,৫৭৯ টি গ্রাম উন্নয়ন সমিতি গঠন করা হয়েছে। এতে অন্তর্ভুক্ত পরিবার (সদস্য) সংখ্যা ৩৮,১০,০০০ জন। তাদের জমাকৃত নিজস্ব সঞ্চয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৪ শত ৫০ কোটি ১৪ লাখ টাকা। সারাদেশে এ প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় কাজ করে যাচ্ছে। প্রকল্প এলাকার উপজেলাগুলোতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নিয়ন্ত্রণে এসব প্রকল্পের বাস্তবায়ন করা হচ্ছে সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে। প্রকল্প সমন্বয়ে রয়েছেন জেলা প্রশাসক।
একটি বাড়ী, একটি খামার প্রকল্পের মাধ্যমে যেমন গ্রামের হাজার হাজার দরিদ্র পরিবারের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটেছে, ঠিক তেমনি দেশের বেকারত্বদূরীকরণে ব্যাপক ভূমিকাও রেখেছে এই প্রকল্প। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী এই প্রকল্পে ৭ সহ¯্রাধিক শিক্ষিত বেকারের কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে। ইতোমধ্যে এই প্রকল্পের মাধ্যমে পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকে ২ হাজার ৪ শত ৭১ জন ব্যক্তিকে স্থানান্তর করা হয়েছে।
এই প্রকল্পের আওতায় গরু পালন করে স্বচ্ছলতা অর্জন করেছেন নারুয়া গ্রামের মোছাঃ আঞ্জু বেগম। তিনি জানান আগে তাদের সংসারে অভাব ছিল। ঠিকমত খাওয়াপড়া জুটতনা। ছেলেমেয়েদের স্কুলে পাঠানো সম্ভব ছিলনা। বর্তমানে একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্পের মাধ্যমে সঞ্চয় গড়ে তুলেছি অন্যদিকে গাভী পালনের মাধ্যমে দুধ বিক্রি করে সংসারে স্বচ্ছলতা এনেছি।
জামালপুর ইউনিয়নের গোসাইগোবিন্দপুর গ্রামের মো. হোচেন আলী শেখ। তিনি এ প্রকল্পের একজন সদস্য। তিনি সমিতির সদস্যভুক্ত হয়ে সঞ্চয় করছেন। আবার এখান থেকে ঋণ গ্রহণ করে বাশ ক্রয় করে হাঁস-মুরগির ঝুড়ি, গরুর টোনাসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র কুঠির শিল্প তৈরির কাজ করেন। বর্তমানে তিনি একজন স্বাবলম্বী। সংসারে তার আর্থিক দৈন্যতা দুর হয়েছে।
বালিয়াকান্দি উপজেলা প্রকল্প সমন্বয়কারী বিধান কুমার দাস বলেন, “বর্তমান সরকার দেশব্যাপী গ্রামাঞ্চলে ‘একটি বাড়ি, একটি খামার’ প্রকল্পের মাধ্যমে দারিদ্র বিমোচন করেছে। বালিয়াকান্দি উপজেলায় ২০০৯-১০ অর্থবছরে এই প্রকল্প শুরু হয়। সহ¯্রাধিক সদস্য নিয়ে কাজ শুরু হলেও বর্তমানে উপজেলার ৭টি ইউনিয়নের সদস্য সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ৭ শত ১০ জনে। শুরুতে উপজেলায় মোট তহবিল ছিল ৫ লাখ ৮৬ হাজার ৭৫ টাকা। বর্তমানে মোট তহবিল ১০ কোটি ৫৬ লাখ ৯২ হাজার টাকা।
তিনি আরও জানান, উপজেলায় এই প্রকল্পে সুবিধাভোগীদের মধ্যে এ পর্যন্ত প্রায় ১৫ কোটি ৪৫ লাখ ৪৯ হাজার টাকার ঋণ দেয়া হয়েছে। সুবিধাভোগীরা প্রত্যেকে মাসিক ২০০ টাকা হারে প্রায় ৩ কোটি ৩৬ লক্ষ ৩৩ হাজার টাকা সঞ্চয় জমা করেছেন। এছাড়া এ প্রকল্পের আওতায় ৬ কোটি ৪৪ লাখ ৭৯ হাজার টাকা অনুদান প্রদান করা হয়েছে।
বিধান কুমার দাস আরও বলেন, ইতোমধ্যে বারুগ্রাম আশ্রয়ন প্রকল্পের ৫৯ জনকে সমিতিভুক্ত করা হয়েছে। তারা ১ লক্ষ ৫ হাজার ৯ শত ৪০ টাকা জমাও সঞ্চয় করেছেন। ইতোমধ্যে ১৭ জন সদস্যকে ১ লক্ষ ৭০ হাজার ঋণ দেওয়া হয়েছে। আশা করছি একটি বাড়ী একটি খামার প্রকল্পের মাধ্যমে তারা স্বাবলম্বী হবে’। এই প্রকল্প মূলত ঋণ দেওয়া নয় ‘আয় করে দায় পরিশোধ করা’। ‘একটি বাড়ি একটি খামার’ প্রকল্প উপজেলার গ্রামীণ অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছে বলে মনে করেন তিনি।
‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর একটি বাড়ী একটি খামার প্রকল্পের মাধ্যমে গ্রামের অতি দরিদ্র পরিবারগুলো ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পাচ্ছে। এ প্রকল্পের সদস্যরা সবজিচাষ, কৃষি, গরু মোটাতাজাকরণ, গবাদি পশু পালন, কুঠির শিল্প, মৎস্যচাষ, হাস-মুরগী পালন, নার্সারী, ক্ষুদ্রব্যবসাসহ বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে ঋণ নিয়ে অর্থনৈতিকভাবে স্বর্নিভর হচ্ছে। সঠিকভাবে এ প্রকল্প বাস্তবায়িত দারিদ্রতা চিরদিনের জন্য নির্মুল হবে বলে মনে করেন বালিয়াকান্দি উপজেলা পল্লী উন্নয়ন কর্মকর্তা আব্দুর রশিদ খান’।
বালিয়াকান্দি উপজেলার উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. মাসুম রেজা বলেন, ‘একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্প মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি দুরদর্শী চিন্তা চেতনার ফসল। এই প্রকল্পের মাধ্যমে উপজেলার অতি দরিদ্র পরিবারগুলো আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হচ্ছে, দারিদ্রতা হ্রাস পাচ্ছে। দেশ টেকসই উন্নয়নের পথে এগোচ্ছে’। ইতোমধ্যে বারুগ্রাম আশ্রয়ন প্রকল্পের সদস্যদের এ প্রকল্পে অর্ন্তভুক্ত করা হয়েছে।
আমি আশাবাদি আমাদের সহযোগিতা নিয়ে উপজেলার দরিদ্র শ্রেণির মানুষ (প্রকল্পের সদস্য) তাদের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটাতে পারবে। সঠিকভাবে এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে দেশ থেকে দারিদ্রতা চিরদিনের জন্য নির্মুল হবে মনে করেন তিনি।
রাজবাড়ী জেলা প্রশাসক মো: শওকত আলী বলেন, ‘একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্প দারিদ্র্য বিমোচনে প্রধানমন্ত্রীর একটি অগ্রাধিকারমূলক কর্মসূচি। রাজবাড়ী জেলায় এই কর্মসূচি সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে। এ প্রকল্প দারিদ্র্য দূরীকরণে ব্যাপক ভূমিকা পালন করছে’।
প্রকল্প পরিচালক আকবর হোসেন জানান, দারিদ্র্য বিমোচন ও টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের লক্ষ্যে প্রকল্পটি হাতে নেয়া হয়েছে। গ্রামের দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে স্বাবলম্বী করার ক্ষেত্রে প্রকল্পটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
Design by: JIT Solution