চিকিৎসা পেশা তো শুধু চাকরী নয়

0
948

ডাঃ মেহেদি হাসান বিপ্লব।।

প্রচন্ড মন খারাপ নিয়ে বসে আছি।
চিকিৎসা পেশাটা আমার কাছে পেশার চেয়ে বেশী কিছু।

আমি ছোটখাট একজন কার্ডিওলজিস্ট।
হার্ট এটাকে মৃত্যুভয় নিয়ে একটা পেশেন্ট যখন সিসিইউ তে আসে তখন নিমেষেই সেটা ম্যানেজ করে ফেলার পর পেশেন্টের মুখে যে হাসি দেখতে পাই তার তুলনা কোন এমাউন্টের বেতন দিয়ে করা সম্ভব নয়।

Complete Heart block এর একটা মৃত্যুপথযাত্রী পেশেন্ট রাত তিনটায় আসলে ১০ মিনিটের মাঝে Temporary Pacemaker বসিয়ে রোগীকে সেযাত্রায় বাঁচতে সাহায্য করার যে অনুভূতি সেটার সাথে কোন আনন্দের তুলনা হয়না।

প্রচন্ড শ্বাসকষ্ট নিয়ে আসা Heart Failure এর একটা পেশেন্ট একটা নিশ্বাসের জন্য ছটফট করতে থাকা অবস্থায় তাকে ইন্টিউবেট করে ভেন্টিলেশন সাপোর্টে দেয়ার সাথে সাথে তার কষ্ট কমিয়ে দেয়ার মত ঘটনা আমাদের পরিতৃপ্ত করে।

সারাদিন কাজ করে যে রেমুনারেশন বা এপ্রিশিয়েশন আমরা উপরমহল বা জনগনের থেকে পাই সেটা হতাশ হবার মতই।কিন্তু এ নিয়ে সত্যিই কখনো মন খারাপ করিনি।আমার নিজের কাজকে আমি প্রচন্ড ভালোবাসি।
পেশাগত অমর্যাদা, অসম্মান ও চিকিৎসা বিষয়ে অব্যবস্থাপনা নিয়ে সবসময় কথা বলেছি,লিখেছি ও বিভিন্ন আন্দোলনে সক্রিয় থাকার চেষ্টাও করেছি।কিন্তু চিকিৎসক হবার জন্য নিজে হীনমন্যতায় ভুগিনি।অন্য কিছু হবার স্বপ্ন কখনোই ছিলোনা।মেডিকেল ছাড়া আর কোথাও ভর্তি হবার চেষ্টাও করিনি ছাত্র হিসেবে।

নিজের বন্ধুবান্ধব যারা লেখাপড়ায় অনেকেই আমার চেয়ে এগিয়ে না থেকেও এখন প্রশাসন বা পুলিশে চাকরী করার সুবাদে সমাজে অন্যভাবে সম্মানিত।এটা নিয়েও কখনো আফসোস হয়নি।কারণ ওটা তো আমি কখনো হতে চাইনি।আমি যেটা চেয়েছি সেটা হতে পেরেছি,এতেই সবসময় খুশি ছিলাম।

বিগত কয়েকদিন ধরে সারা দেশে চিকিৎসক পেশাজীবীদের নিয়ে যেটা হচ্ছে তাতে মনে হচ্ছে এদেশে সবচেয়ে দূর্ণীতিবাজ হচ্ছে চিকিৎসকরা।

দেশের দুর্ণীতিগ্রস্ত পেশাগুলোর মধ্যে চিকিৎসাক্ষেত্র ৭ নম্বরে দেখানো হয়েছে।আবার চিকিৎসা ক্ষেত্রে দূর্ণীতির পুরোটাই চিকিৎসকদের নাগালের বাইরে। এই দুর্ণীতি কোন ধরণের সিন্ডিকেট দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় তা সবাই জানে।কিন্তু সেসকল রাঘব বোয়ালদের পেছনে না লেগে রাষ্ট্রযন্ত্র ও মিডিয়া চিকিৎসকদের যেভাবে জনগনের মুখোমুখি দাড় করিয়ে ভিলেন বানিয়ে দিচ্ছে তাতে সত্যিই আজ প্রথমবারের মত মনে হলো চিকিৎসক হওয়াটা জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল ছিলো।
সাধারণ জনগন চিকিৎসকদের আজ শত্রু মনে করা শুরু করেছে।

চিকিৎসকদের কর্মস্থল কতটা অনিরাপদ সেটা কমবেশী সবাই জানেন।
চিকিৎসা সেবার উন্নয়নের জন্য চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা উন্নত না করে চিকিৎসকদের পিষে ফেললে ফলাফল পাওয়া যাবেনা এটা নীতিনির্ধারকরাও জানেন।কিন্তু স্ট্যান্টবাজির জন্য নিরীহ চিকিৎসকদেরই বেছে নিচ্ছে দেশের সর্বস্তরের অভিভাবকরা।

সকালে এসে একজনকে পেলেননা বা দশটায় অফিসে এসেছে বলে রিপোর্ট করলেন অথচ এটা প্রচার করলেন না যে উপজেলায় সেই একমাত্র চিকিৎসকটি রাত ৪ টায়ও জরুরী বিভাগে রোগী দেখেছেন।
শেষরাতে একটু রেস্ট নিতে হয়তো ডরমিটরিতে ছিলেন।
আমাদের দেশের সরকারী হাসপাতালগুলোতে কি পরিমাণ প্রেশার এককজন চিকিৎসক নেন এটা যারা কাছ থেকে দেখেননি তারা বুঝবেন না। একজন কমপক্ষে ৫/৬ জনের কাজ করেন।

ফাঁকিবাজি কেউ করেননা সেটা আমি বলছিনা,তাদের প্রয়োজনে শাস্তি দেয়া হোক। কিন্তু ৯৮% চিকিৎসক সপ্তাহে ৪৮ ঘন্টার চেয়ে অনেক বেশী সময় কাজ করেন হাসপাতালে, এটা নিয়ে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই।
কোনকিছু বিবেচনা না করে ঢালাওভাবে দোষ দিয়ে চিকিৎসক সমাজের মনোবল ও ডেডিকেশনে যে আঘাত দেয়া হলো সেটার মূল্য এ জাতিকেই দিতে হবে।

আজ থেকে আমি আমার চাকরীটাই শুধু করবো।

চিকিৎসা ও তার ব্যবস্থাপনা এবং মানবসেবার ঠিকাদারি তো আমি নেই নাই। এ দায়িত্ব রাষ্ট্রের।
জোর করে চাকরী করাতে পারবেন,চিকিৎসা কিভাবে করাবেন?

চিকিৎসা তো শুধু চাকরী নয়, তাইনা?

লেখকঃ
ডাঃ মেহেদি হাসান বিপ্লব
কার্ডিওলজিস্ট, ন্যাশলান ইন্সটিটিউট অব কার্ডিওভাস্কুলার ডিজিজেজ 
সেন্ট্রাল কাউন্সিলর, বিএমএ

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here