1. jitsolution24@gmail.com : Rajbaribd desk : Rajbaribd desk
বৃহস্পতিবার, ২০ জানুয়ারী ২০২২, ০৪:১৬ পূর্বাহ্ন

বাপ-দাদার আমল থেকে দখলে থাকা ভুমিতে অধিকার চায় ওরা

Reporter Name
  • Update Time : সোমবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯
  • ৬১২ Time View

সোহেল রানা ॥
রাজবাড়ী রেলওয়ে বিবেকানান্দ পল্লী, গোয়ালন্দ রেল কলোনী, পাংশা পৌরসভার মৌকুড়ীসহ জেলার বালিয়াকান্দি, কালুখালী, পাংশা, গোয়ালন্দ, রাজবাড়ী সদর উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে ছড়িয়ে রয়েছে প্রান্তিক জনগোষ্টির বসবাস।
বাপ-দাদার আমল থেকে ওই জমিতে বসবাস করলেও জমির মালিকানা পায়নি আজও। জমির বন্দোবস্ত পেতে গেলে টাকার প্রয়োজন হয়। এ ভয়ে এরা সরকারী দপ্তরে আবেদনও করে না। এভাবেই বসবাস করে চলেছে বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ।
এদেরকে সরকারী ভাবে বন্দোবস্ত প্রদানের উদ্যোগ গ্রহন করলে তারা জমির মালিকানা পাবে বলে সচেতন মহলের আশা। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা জমি আছে ঘর নেই প্রকল্প চালু করেছে। ভুমিহীনদের জন্য আবাসন ব্যবস্থা চালু করেছে। তবে প্রান্তিক ভুমিহীনদের জন্য পৃথক আবাসন ব্যবস্থার উদ্যোগ গ্রহন করতে হবে।
রাজবাড়ীর ভুমি-মাটির প্রকৃতি ভিন্ন ধরনের নদী-নালা, খাল-বিল, বাওড়-ডোবা আর বিলের জমি জলাকুন্ড বিস্তার এলাকা জুড়ে বিদ্যমান। একসময় এ অঞ্চলের দরিদ্র মানুষেরা বিল থেকে শাপলা, শালুক, ড্যাপ কুড়িয়ে খাদ্য যোগান করে জীবন-জীবিকা নির্ভর করতো। দরিদ্র মানুষেরা অবাদে বিচরণ করতো বিলে। দেশী জাতের মাছের অভয়াশ্রম ছিল বিলে। মাছ শিকার করে বাজারে বিক্রয় করে পরিবারের ভরনপোষন করতো। ১৯৫০ সালে জমিদারী প্রথা উচ্ছেদ আইনের ৮১ধারা মতে বিল শ্রেনী ভুক্ত জমি সরাসরি সরকারে নামে ১নং খতিয়ান ভুক্ত খাস জমি হিসাবে গন্য হয়। জলাশয়ে মাছ ধরার প্রথাগত অধিকার পায়। জমিদারী প্রথা রদ করলে জলমহলগুলি সরকারের রাজস্ব বিভাগের নিয়ন্ত্রনধীনে চলে যায়। ডিসির মাধ্যমে এডিসি তহশীলদার ক্ষুদ্র অঞ্চলের দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তিরাই জলাশয় থেকে রাজস্ব আদায় করেন। জেলেরা আশির দশকে জলমহল নিয়ে আন্দোলনের সুত্রপাত ঘটায়। যা পানি আন্দোলন হিসাবে পরিচিত লাভ করে ”জাল যার জলা তার”। সরকারী খাস জমি হওয়া সত্বে কালের অবর্তনের কারনে বিল গুলি ভরাট হয়ে ওঠে, তখনি চলে বিলের জমি দখলের মহোৎসব। আজ দখলদারদের স্বার্গরাজ্য এ সকল বিলের জমি ভুমিগ্রাসী চক্রেরা কুক্ষিগত করেছে। বিলের জমির মালিক সরকার বিল শ্রেনী ভুক্ত খাস জমি ভুমিগ্রামীদের কোন বৈধ সত্বের কাগজ পত্র ছিল না আজো নাই। ভুমির মালিকানার দাবীতে ভুমিহীনরা তাদের অধিকার প্রতিষ্টা করতে সক্ষম অর্জন করে। সরকার থেকে জমির দখল সত্ব বজায় রাখার উদ্দেশ্য ভুমিহীনদের মধ্যে বন্দোবস্তর প্রদান করে। ভুমিহীনরা চাষাবাদের মাধ্যমে জমিতে ভোগ দখল করতে থাকে। ভুমিগ্রাসীরা সকল রকম চক্রান্ত করে জমি তাদের দখলে রাখার। তবুও দরিদ্র ভুমিহীনরা তাদের নায্য অধিকার আদায়ের হাল ছাড়েনি।
অবহেলার শিকারের মধ্যে অন্যতম রাজবাড়ীর হরিজন জনগোষ্টি। বিটিশ উপনি রাজত্বকাল থেকে হরিজন জনগোষ্টির পুর্বপুরুষ বসবাস করছে। ওই জমিতে আড়াইশত বছর দখল সত্ব থেকেও তারা জমির মালিকানার অধিকার থেকে বঞ্চিত আজও। রাজবাড়ী পৌর শহরের দৌলৎদিয়া-পোড়াদাহ রেলওয়ে ষ্টেশন ঘেষে সরকারী জমিতে গড়ে ওঠা বিবেকান্দ্র হরিজন পল্লী। অনেকেই সরকারী কোয়াটারে মাসিক ভাড়া দিয়ে বসবাস করেন। আবার অনেকে এনজিও থেকে ঋন নিয়ে ও বিভিন্ন উপায়ে পাটকাঠি, টিনসেট ঘর উত্তোলন করে স্ত্রী, সন্তান, মাতা-পিতা নিয়ে গাদাগাদি করে বসবাস করেন। সরকারী জমিতে পুর্বপুরুষের আমল থেকে বসবাস করলেও তাদের ভাগ্যে জোটেনি মাথা গোজার একখন্ড ভিটে। নিজের জমি না থাকার ফলে আবাসন সমস্যা তাদের অন্যতম। তাদের বেশির ভাগ পরিবারের সদস্যদের প্রধান আয়ের উৎস সামান্য বেতনে পৌরসভায় চাকুরী। সামান্য বেতনে জীবন ও জীবিকার চাহিদা মেটানো দুষ্কর। সরকারী চাকুরীর ক্ষেত্রে, সরকারী অন্যান্যে সুযোগ সুবিধার ন্যায্য দাবীর হিস্যা না পাওয়ায় তারা নিজ উদ্দ্যোগে গড়ে তুলেছেন একটি সমবায় সমিতি। এ বিবেকান্দ পল্লীর শিশুরা অল্প সংখ্যক ৫বছরে বয়সে ও বেশির ভাগ শিশু ৬ থেকে ৭বছর বয়সে স্কুলে যায়। অধিকাংশই সঠিক কর্মসংস্থান না থাকার কারনে আর্থিক অসচ্ছলতা থাকে সারা বছর। সরকারী কোটায়ারে বসবাস করলেও দীর্ঘদিন কোন প্রকার সংস্কারের উদ্দ্যোগ না নেওয়ায় জরাজীর্ন পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে। বর্ষা মৌসুমে তাদের দুর্ভোগ সৃষ্টি হয় পানি নিষ্কাষনের ব্যবস্থা না থাকায়। বিবেকান্দ পল্লী সংলগ্ন পৌরসভার পানির ট্যাংক স্থাপন করা হলেও পানি সরবরাহ করা হয়না হরিজন পল্লীর বাসিন্ধাদের মধ্যে। ৪০টি টিউবয়েল বসিয়ে সুপেয় পানির চাহিদা মেটাচ্ছেন তারা। পল্লীর জন্য পৌরসভা থেকে ৫টি বাথরুম নির্মান করা হলেও বর্তমানে ২টি রয়েছে সচল। তাও অকেজো ও ব্যবহার করার অনউপযোগি হয়ে পড়েছে। ৩-৪টি পরিবার মিলে ল্যাট্রিনের ব্যবস্থা করতে বাধ্য হয়েছেন।
রাজবাড়ী বিবেকান্দ হরিজন পল্লীর বাসিন্ধা রতন ভক্ত, মিতা সরকার, রাজকুমার, শ্যাম ভক্ত, উত্তম দাস, রমেন সরকার, মিলন দাস হেলা, রাধা রানী, গৌতম দাস, কৃষন, পাপন, রবিলাল জানান, বাপ দাদার নয় বিটিশ আমল থেকে পুর্ব পুরুষেরা সরকারী জমিতে বসবাস করে আসলেও আমাদের ভাগ্যে এক টুকরো জমি জোটেনি। স্বাধীন দেশে বসবাস করেও যেন আমরা পরাধিন জীবন যাপন করছি। সরকার সারা দেশে ভুমিহীনদের মাঝে খাস জমি বন্দোবস্ত প্রদান করলেও আমরা কি ভুমিহীন হতে পারিনি। ঘর উত্তোলন করতে না পারার ফলে পরিবারের লোকজনদেরকে নিয়ে গাদাগাদি করে একঘরে বসবাস করতে হয়।
রাজবাড়ী জেলার পাংশা পৌর শহরের ৯নং ওয়ার্ডের মৈশালা-মাগুরাডাঙ্গী গ্রামে আদীকাল থেকে গড়ে ওঠে ঋষি পল্লী। এ পল্লীতে ৩৭টি পরিবার বসবাস করে। জনসংখ্যাও কম নয়। ছোট-বড় দিয়ে প্রায় ৩শতাধিক জন রয়েছে। পুর্ব পুরুষের আমল থেকেই তারা এখানে ঘাটি গেড়ে বসবাস করছে। পৌর শহরের মধ্যে বসবাস হলেও এখানে কোন উন্নয়নের ছোয়া লাগেনি। ঋষি পল্লীর মধ্যে কেউ কেউ জমি অন্যত্র বিক্রি করার কারনে অনেকে বড় বড় ভবন তুলেছে। ফলে ঋষিদের কুড়ে ঘর গুলো যেন চোখে পড়ার নেই। পুর্ব পুরুষেরা আদীকাল থেকেই যে পেশায় সম্পৃক্ত ছিল তারাও সেটা ধরে রেখেছে। তবে দিনবদলের সাথে সাথে তাদের সচেতনতাও বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রতিটি পরিবারের ছোট ছেলে মেয়েরা স্কুল ও কলেজে পড়াশোনা করছে। দারিদ্রতার কারনে অনেক ঋষি পরিবারের পুর্ব পুরুষের সম্পত্তি কতিপয় প্রভাবশালী ভুমি দস্যুরা অবৈধ ভাবে দখল করেছে। প্রভাবশালী হওয়ার কারনে তারা প্রতিবাদ করার সাহস পায় না।
পল্লীর বাসিন্ধাদের চলাচলের কোন সড়ক নির্মান করা হয়নি। ঘনবসতি হওয়ায় ঘরের পাশ ঘেষে যে জায়গা রয়েছে তাই পথ হিসাবে ব্যবহার করা হয়। প্রতিটি পরিবারের সদস্যরা বাঁশ ও বেত দিয়ে তৈরী করছে বাঙ্গালী পরিবারের নিত্য দিনের কাজের জন্য আসবাবপত্র। তাদের তৈরীকৃত আসবাবপত্র গুলোর মধ্যে রয়েছে কুলা, ডালা, চালুন, বেড়ী, খৈ-চালা, ধামা, কাটা, সের, বাঁশের ঝুড়িসহ হরেক রকমের জিনিস। এখন অনেকেই পেশা পরিবর্তন করে কেউ কেউ শহরে তৈরী করেছে সেলুন। আবার যারা বাশ ও বেতের তেজসপত্র তৈরী করে তাতে না পোষানোর কারনে কাজের ফাকে বিভিন্ন অনুষ্ঠানাদিতে বাদ্য যন্ত্র বাজিয়ে থাকে। বাড়ী-ঘরের ফাঁকে-ফাঁকে রয়েছে ডোবা। সামান্য পানি জমেছে। বর্ষা মৌসুম শুরু হওয়ার সাথে সাথে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। পানিতে হয়ে যায় একাকার। বাসিন্ধাদের পোহাতে হয় দুর্ভোগ। যেন কারোর দুর্ভোগ লাঘবে কোন পদক্ষেপ নেই।
ঋষি পল্লীর বাসিন্ধা রনজিৎ কুমার দাস, মরিমল কুমার দাস, অরুন কুমার দাস, জিতেন কুমার দাস, পরশ কুমার দাস জানান, পুর্ব পুরুষের আমল থেকে এখানে বসবাস করছি। আদি পেশা হিসাবে বাশ ও বেতের তৈরী তেজসপত্র তৈরী করে বাজারে বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করি। বাশ ও বেতের দাম বৃদ্ধি পাওয়ার কারনে ও তৈরীর জন্য কাচামাল বাশ ও বেত আনতে কালুখালী ও মৌকুড়ি বাজারে যেতে হয়। ক্রয় করে আনতে অনেক খরচ পড়ে যায়। অল্প পুজিতে তৈরীকৃত মালামাল বিক্রি করে সংসার চালানো দুস্কর হয়ে পড়েছে। অনেকেই বিভিন্ন এনজিও থেকে ঋন গ্রহন করে বাড়ীর মহিলাদেরকে দিয়ে এসকল তেজসপত্র তৈরী করে আর নিজেরা কেউ সেলুন, বাদ্যযন্ত্র বাজানোর কাজ, রিক্সা চালানোসহ বিভিন্ন কাজে ঝুকে পড়ছে। যে যে রকম পেশাই করুক না কেন, কোন মত সংসার চলে। বিদ্যুতের ব্যবস্থা রয়েছে। সরকার থেকে সুপেয় পানির জন্য কোন ব্যবস্থা না নেওয়ার ফলে যার যার পরিবারের জন্য এনজিও ঋন অথবা ধার দেনা করে ব্যাক্তি উদ্দ্যোগে টিউবয়েল বসিয়েছে। কিছু কিছু পরিবারকে এনজিও ব্র্যাক থেকে স্বাস্থ্য সম্মত পায়খানার জন্য স্যানিটেশন ব্যবস্থা করার ফলে অন্যান্য পরিবারের সদস্যরা ব্যাক্তি উদ্দ্যোগে স্যানিটেশনের ব্যবস্থা করেছে।
শুশান্ত কুমার দাস, মিন্টু কুমার দাস, গনেশ কুমার দাস, শ্যাম কুমার দাস জানান, পল্লীতে ঢোকার কোন রাস্তা নেই। পৌরসভা বা সরকার থেকে কোন উদ্দ্যোগ গ্রহন করা হয় না। ভোটের আগে সবাই এসে ঋষি পল্লীর ভোটের আশা করে। নানা রকম প্রতিশ্রুতি দেয়, ভোট শেষে আর পাওয়া যায় না। জলাবদ্ধতা নিরসনে কোন পদক্ষেপ কেউ নেয় না। জনপ্রতিনিধিদের কাছে বার বার দাবী জানিয়ে আসলেও কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। ঋষি পল্লীর বাসিন্ধারা সবাই একজোট থাকার কারনে ও সরকারী বেসরকারী অফিসের সেবা গুলো জানার ফলে আগে কোন সরকারী কোন সহযোগিতা পেত না। ইদানিং একটু সচেতন হওয়ার কারনে দু,একজনকে বিধবা ভাতা, বয়স্কভাতা, ভিজিএফ কার্ড দেওয়া হচ্ছে। এ পল্লীর একমাত্র কালী মন্দিরটি অর্থাভাবে কাজ সম্পন্ন হয়নি। এখানে যারা বসবাস করে তারা সবাই অসচ্ছল হওয়ার কারনে নিজেরা কিছু অর্থ তুলে আর সরকার থেকে ১মেট্রিকটন চাউল দেওয়া হয়েছিল তা দিয়েই কোন মত কাজ করা হয়েছে। আরো কিছু অর্থ পেলে মন্দিরটি সংস্কার করে পুজা অর্চনা করা যেত।

বাংলাদেশ হরিজন ঐক্য পরিষদের রাজবাড়ী জেলা শাখার সভাপতি বাসুদেব মন্ডল জানান, রাজবাড়ী বিবেকন্দ্র পল্লীতে প্রায় ৮৫টি হরিজন পরিবারের ৯শত লোকের বসবাস। প্রায় ৬৫জন পৌরসভায় চাকুরী করে। তাও আজ বঞ্চিত হচ্ছে। তারা আওয়ামীলীগ সরকারের নির্বাচনী ইস্তেহার বাস্তবায়নে গ্রামকে শহরে উন্নীতকরণের লক্ষে হরিজন পল্লীর পরিবারগুলোর মধ্যে মাথা গোজার ঠাই পায় সেলক্ষে তাদের নামে জমি বন্দোবস্ত প্রদান করার ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য প্রানের দাবীতে পরিনত হয়েছে।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
Design by: JIT Solution