“এতো হাজার চিকিৎসকদের বেকারত্ব কী একটি রাষ্ট্রের কাউকে নাড়া দেয় না?”

0
1050
সার্জারী বিভাগের ইন্টার্নী চিকিৎসকদের সাথে লেখক
“idiocracy” নামে একটা ম্যুভি দেখেছিলাম। ওখানে একটা ব্যাপার খুব ‘মজার’ ছিলো। ঐ ম্যুভিতে সমাজের যারা জ্ঞানী বা বিচক্ষণ বুদ্ধিবৃত্তিক সম্প্রদায় ছিলো, তাদের প্রজননের প্রতি আগ্রহ ছিলো না। অন্যদিকে যারা একটু বোকা কিংবা ভোদাই গোছের ছিলো, তারাই ছিলো প্রজননমুখর। ফলে গোটা সমাজ এক সময় এই সব অপদার্থ দিয়ে ভরে যায়।
যাই হোক,
আমি হাসপাতালে ফিরে আসি।
খুব শীঘ্রই আমার আরো একটি ইন্টার্নী ব্যাচের বিদায় বেলা চলে আসবে। এমবিবিএস ডিগ্রী অর্জন করে, ১ বছরের প্রশিক্ষণ কাল শেষ করানোর পরে আমরা বাজারে ছেড়ে দেবো আরো একটি প্রশিক্ষিত দক্ষ সম্প্রদায়। (ইদানিং ‘মেধাবী’ শব্দটা ব্যবহার কম করি। ঐ শব্দটা ব্যবহার করলেই মিডিয়ার মানুষগুলো নিজেদেরকে ‘গরম’ কড়াই এর ‘বেগুণ’ বানিয়ে ফেলেন, আর ছ্যাঁৎ ছ্যাঁৎ করে জ্বলতে থাকেন!!)… তো, বাংলাদেশে আরো এক ব্যাচ চিকিৎসক মাঠে নামবেন তাদের স্কিল আর নলেজ নিয়ে।
অথচ ওদের ভবিষ্যৎ?
কী আশার কথা শুনিয়ে ওদের বিদায় দিচ্ছি?
দেশে চিকিৎসক সংকট আছে।
সরকারী স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনাতে আছে, বেসরকারীতেও আছে। বেসরকারীতে আপনি টের পাবেন কী না আমরা জানিনা। তবে আছে সেটা মিথ্যা না।
১০/১২ তালার প্রাইভেট বা কর্পোরেট, হাসপাতাল যাই হোক না কেন, খুবই illpaid একজন মেডিকেল অফিসারকে ২/৩ টা ফ্লোরের সব রোগীকে এক সাথে দেখতে বলা হয়। মানে, চিকিৎসক সেখানে ঐ সব ফ্লোরের দারোয়ান মাত্র। আবার পয়সা দিয়ে এই দারোয়ান রাখতেও প্রাইভেট মালিকানার হাসপাতালগুলোর উদাসীনতা সীমাহীন।
সরকারী হাসপাতালের চিকিৎসক সংকট কমাতে সম্প্রতি অনুষ্টিত একটি বিসিএস পরীক্ষায় সাড়ে ৪ হাজার চিকিৎসক উত্তীর্ণ হয়েছেন। কিন্তু এর জন্য আবেদন করেছিলেন কতো জানেন?
“৪০,০০০ চিকিৎসক”।
এই ৪০,০০০ হাজার চিকিৎসকের সরকারী চাকুরীতে ঢোকার বয়স আছে। মানে এরা জুনিয়র চিকিৎসক সমাজ। এই ৪০,০০০ চিকিৎসক ইন্টার্নী শেষ করার পর থেকে দেশে চিকিৎসক সংকট থাকা সত্ত্বেও সরকারী চাকুরীতে ঢুকতে পারছেন না।
ক্ষতিটা কার হচ্ছে?
যে রাষ্ট্রে একজন চিকিৎসক তার দক্ষতা আর জ্ঞান দিয়ে স্বাস্থ্যসেবায় অবদান রাখতে পারেন না, যে রাষ্ট্রে একজন তরুণ চিকিৎসকের তারুণ্য আর কর্মদক্ষতাকে আমরা ব্যবহার করতে পারিনা, যে রাষ্ট্রে একজন চিকিৎসককে ইন্টার্নী শেষ হয়ে যাবার পরের দিন থেকেই পেশাগত হতাশায় আড়ষ্ট হতে হয়, সেই দেশের চেয়ে দুর্ভাগা দেশ আর কি হতে পারে?
রোহিঙ্গা ক্যাম্পের শরণার্থীদের দিকে খুব অসহায় চোখে তাকাই এখন। অসহায় ওদেরকে লাগে না। অসহায় লাগে ইন্টার্নী শেষ হতে চলা আমার অনুজ চিকিৎসককে।
সাম্প্রতিক কোন এক সমীক্ষায় দেখেছিলাম (পড়েছিলাম), রোহিঙ্গা ক্যাম্পে এসে জন্ম নেওয়া শিশুর সংখ্যা ১ লক্ষ ছাড়িয়েছে। আবার এখানে আসার পরে রাষ্ট্রীয় আদর যত্নে থেকে নতুন গর্ভবতী হয়েছে লাখেরই কাছাকাছি (তথ্য বিভ্রাট হলে ক্ষমাপ্রার্থী। অসভ্যদের প্রজননতত্ত্বের প্রতি আমার আগ্রহ কম, তাই রেফারেন্স কপি পেস্ট করতে ইচ্ছে করলো না)
idiocracy ম্যুভিতে কি আমাদের দেশের চিত্রই দেখানো হয়েছিলো কী না কে জানে?
২০১৯ সাল চলছে…
এই মুহূর্তে বাজারে অর্থনৈতিক নিরাপত্তাহীনতায় ভোগা চিকিৎসকের সংখ্যা প্রায় ৫০ হাজার। এতো বড় একটি পেশাজীবী সম্প্রদায় কোন না কোনভাবে বেকার। রাষ্ট্র এদেরকে ব্যবহার করতে পারছে না, এই তথ্য কী কাউকে নাড়া দেয় না?
খুব শীঘ্রই আরো ১০,০০০ চিকিৎসক যুক্ত হবে এই বহরে।
২০২০ সাল…
২০২১ সাল…
২০২২ সাল…
কতো হবে এই বেকার হতাশাগ্রস্ত মানুষগুলোর সংখ্যা?
চিকিৎসকদের নিয়ে মানুষের অভিযোগের শেষ নেই,
আমাদের এতো বছরের জমা অভিযোগ-অনুযোগগুলো শোনার সময় হবে কি কারো?
একাডেমিক এবং ক্লিনিকাল একটি পদে চাকরী করি বলে, প্রায়ই প্রশ্ন শুনি, “এর পরে কী করবো ভাইয়া?”
কোন উত্তর দিতে পারি না।
আমার আগে আরো অনেকেই এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেন নাই।
আমি সন্দেহ করি,
আমার পরের আরো অনেককেই এই প্রশ্নে নীরব থাকতে হবে।
ভালো থাকুক
এই দুর্ভাগা দেশে জন্ম নেওয়া
জীবিকাযুদ্ধরত প্রতিটি বাংলাদেশী চিকিৎসক।
লেখক ডাঃ রাজীব দে সরকার
লেখকঃ
ডাঃ রাজীব দে সরকার
উপদেষ্টা সম্পাদক, রাজবাড়ীবিডি.কম
রেজিস্ট্রার, সার্জারী বিভাগ, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
প্রচার ও জনসংযোগ সম্পাদক, বিএমএ, রাজবাড়ী
আজীবন সদস্য, স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ (স্বাচিপ)
আহবায়ক, সুহৃদ সমাবেশ, গোয়ালন্দ উপজেলা।
সাবেক সভাপতি, ইন্টার্নী চিকিৎসক পরিষদ, ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
ইমেইলঃ rds@mis.dghs.gov.bd

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here